নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও সহিংসতার ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ার করা হবে’—এমন বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তাঁর এ বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের বক্তব্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপজ্জনক বার্তা দেয়।
দেশের বিভিন্ন স্থানে অপরাধের বিস্তার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছে।
ডা. তাসনিম জারা, যিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পরিচিত মুখ, সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ওঠা একটি অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তুলেছেন, বিরোধী দলে থাকতেই যদি কোনো ব্যক্তিকে তাঁর নিজের বসতভিটায় দাফন করতে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা হাতে পেলে কী করা হবে? তাঁর এ বক্তব্য রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নাগরিক অধিকার ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
এদিকে পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত নয় মাসে দেশে ২ হাজার ৯১১টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১টি হত্যা মামলা হচ্ছে। অপরাধের এমন পরিসংখ্যান জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। খুলনা অঞ্চলে রাতে পুলিশ সদস্যদের একা চলাচল না করার নির্দেশনা দেওয়ার খবরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় এসেছে।
আইজিপির বক্তব্যে নতুন বিতর্ক
গত ২৫ অক্টোবর পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির জানিয়েছিলেন, পুলিশ বাহিনীতে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত দুই মাসে ২৭ জন পুলিশ সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এরপর পুরান ঢাকার চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইজিপি আবারও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন।
তিনি বলেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে এক পক্ষ পুলিশকে ফ্যাসিস্ট বলে, আবার নিষ্ক্রিয় থাকলে দুর্বল বলে আখ্যা দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে এবং সক্ষম করে তুলতে হবে।
আইজিপি আরও বলেন, সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী চলতে হবে। পুলিশ সদস্যদের অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বাহিনীর কোনো সদস্য অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে তাঁর ‘ক্রসফায়ার’সংক্রান্ত বক্তব্যই সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আইজিপি বলেন, ‘কে আসবে, আপা কবে আসবে, ওইটা আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেখার বিষয় না। আমাদের দায়িত্ব, আইন ও সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেইটাই আমরা করব। যেখানে ক্রসফায়ারের যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে আমরা সেটাই করব।’
তিনি আরও বলেন, পুলিশকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করা উচিত নয়। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর পুলিশের দুর্বল অবস্থার কথা উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, সে সময় পুলিশ রাস্তায় দায়িত্ব পালন করতে ভয় পেত এবং বিভিন্ন স্থানে যেতে সাহস পেত না। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণে পুলিশ দিনরাত পরিশ্রম করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
টিআইবির প্রতিবাদ, বিচারবহির্ভূত হত্যার আশঙ্কা
আইজিপির ‘অনুমতি পেলেই ক্রসফায়ার’ বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবিলার পরিবর্তে এ বক্তব্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপজ্জনক বার্তা দেয়।
টিআইবির অবস্থান অনুযায়ী, এ ধরনের বক্তব্য সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। অপরাধ দমনের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার সম্ভাবনা সামনে আসায় মানবাধিকার, আইনি প্রক্রিয়া ও জবাবদিহির প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা যেমন জরুরি, তেমনি সেই ভূমিকা হতে হবে আইনসম্মত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার পরিবর্তে বিচারবহির্ভূত পন্থার ইঙ্গিত জনমনে উদ্বেগ বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে।
সরকার ও বিরোধী দলের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র
দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যেও উদ্বেগের বিষয় উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান গত সেপ্টেম্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, রাষ্ট্র ও জনগণের প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে।
তবে কয়েক দিন আগে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ কেন্দ্র ও ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন।
তিনি জানান, বর্তমান সরকারের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর মতো কোনো বিশেষ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বর্তমানে কোনো চ্যালেঞ্জ অনুভব করছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশ মাঝেমধ্যে হামলার শিকার হচ্ছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপরও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ বক্তব্যের পরদিনই মুন্সীগঞ্জে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শাহবাগে গণবিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের কোথাও মানুষের নিরাপত্তা নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হলেও তিনি সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ অবস্থায় সালাহউদ্দিন আহমদের আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
বিনিয়োগ ও অর্থনীতিতেও নিরাপত্তার প্রভাব
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি না হওয়ায় অর্থনীতি ও বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদেশ সফরগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছেন। জাপান সফরেও দেশটির ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
কিন্তু বিনিয়োগের জন্য শুধু সরকারি আশ্বাস যথেষ্ট নয়। ব্যবসা পরিচালনায় নিরাপত্তা, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব থেকে সুরক্ষা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস-বিদ্যুতের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি জানিয়ে আসছেন।
দেশের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও সহিংসতার অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কাও বাড়ছে
এদিকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী এ বিষয়কে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তদন্ত ও তথ্যের ভিত্তিতে দায়ীদের শনাক্ত করা জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, চাঁদাবাজি ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় জনসাধারণ
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সামনে এসেছে। একদিকে পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার জরুরি, অন্যদিকে বাহিনীর সদস্যদের অপরাধের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি—অপরাধ দমনে নিয়মিত আইন প্রয়োগ, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করা। বিচারবহির্ভূত পন্থার পরিবর্তে আইনি প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করাই আইনের শাসনের মূলনীতি।
দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে সরকার কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে সাধারণ মানুষের।
নিউজ বাংলা চ্যানেল