ঢাকা | বঙ্গাব্দ

আশুরা : ইতিহাসের বিপ্লব ও ন্যায়ের আলোকবর্তিকা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jul 5, 2025 ইং | Photo Card
আশুরা : ইতিহাসের বিপ্লব ও ন্যায়ের আলোকবর্তিকা ছবির ক্যাপশন: মুফতি আজম ওবায়দুল্লাহ
ad728
মুফতি আজম ওবায়দুল্লাহ :: আজকের বিশ্বে যখন অসত্য, জুলুম ও অন্যায়ের ছড়াছড়ি, তখন ইমাম হোসাইনের আদর্শ যেন আমাদের সামনে এক আলোকবর্তিকা। সত্য, ন্যায়, মানবতা, নৈতিকতা ও ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় হোসাইন (রা.) আমাদের চিরন্তন অনুপ্রেরণা। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবন তথা জীবনের সর্বক্ষেত্রে কারবালার শিক্ষা প্রযোজ্য। আত্মস্বার্থ ত্যাগ করে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো, শাসকের অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং মজলুমের পাশে দাঁড়ানো এই শিক্ষাগুলো আজকের মুসলমানদের জন্য অতি জরুরি। আশুরা কেবল একটি ইতিহাস নয়, বরং তা একটি আধ্যাত্মিক বিপ্লব, ইসলামের চিরন্তন আদর্শ ও সত্য-ন্যায়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস ‘মহররম’। এই মাসের ১০ তারিখকে ‘ইয়াওমে আশুরা’ বলা হয়, যা মুসলমানদের কাছে এক পবিত্র ও বেদনাবিধুর দিন। এই দিনে ঘটেছিল ইতিহাসের এক করুণ ও গৌরবময় অধ্যায়, কারবালার প্রান্তরে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত। তিনি কুফার শাসক ইয়াজিদের অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে মাথা নত না করে জীবন বিলিয়ে চিরন্তন সত্য, ন্যায় ও ইসলামি আদর্শের বিজয় ঘোষণা করে যান।
আশুরা শুধু একটি শোকাবহ দিন নয়; বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, সত্যের পথে অবিচল থাকা এবং ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় চেতনার প্রতীক। এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্মরণীয় দিন নয়, বরং তা মানবতা, ন্যায়বিচার ও আত্মত্যাগের এক আধ্যাত্মিক আলোকবর্তিকা। 
আশুরার গুরুত্ব শুধু কারবালার ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি অতীত বহু নবী-রাসুলের যুগ থেকেও এক তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। হাদিস অনুযায়ী এই দিনে হজরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হয়, হজরত নূহ (আ.)-এর কিশতি তুফান থেকে নিরাপদে ভূমিতে পৌঁছে, হজরত মুসা (আ.) ফেরাউন থেকে মুক্তি পান এবং অনেক নবীর ওপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ বর্ষিত হয়।
নবী মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর দেখতে পান, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা পালন করছে। তিনি এর কারণ জানতে চান। তারা জানায়, এদিন আল্লাহ তায়ালা হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলদের ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘আমরা মুসার প্রতি তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার।’ এরপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা রাখেন এবং সাহাবাদেরও তা রাখার নির্দেশ দেন। অতঃপর বলেন, ‘আমি যদি আগামী বছর পাই, তবে ৯ তারিখেও রোজা রাখব।’ (সহিহ মুসলিম)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর ইসলামের খিলাফত ব্যবস্থা প্রথমে হজরত আবু বকর (রা.), এরপর পর্যায়ক্রমে হজরত ওমর (রা.), উসমান (রা.) ও আলি (রা.)-এর হাতে আবর্তিত হয়। হজরত আলি (রা.)-এর শাহাদাতের পর তাঁর পুত্র হাসান (রা.) খিলাফত গ্রহণ করলেও কল্যাণের স্বার্থে তা হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে হস্তান্তর করেন। মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইন্তেকালের আগে তার পুত্র ইয়াজিদকে পরবর্তী খলিফা ঘোষণা করেন, যা ছিল স্পষ্টতই ইসলামি পরামর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থার পরিপন্থী।
ইয়াজিদ ছিল অন্যায়পরায়ণ এবং দুনিয়াদার শাসক। ইসলামের মহান আদর্শে তার কোনো শ্রদ্ধা ছিল না। মুসলিম উম্মাহর অনেকেই ইয়াজিদের খিলাফতকে বৈধতা দেননি। বিশেষ করে নবী পরিবারের উত্তরসূরি, ইমাম হোসাইন (রা.) ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানান। এ অস্বীকৃতি থেকেই সংঘাতের সূত্রপাত হয়।
৬১ হিজরির মহররম মাসের ২ তারিখ, ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর পরিবার-পরিজন ও স্বল্পসংখ্যক অনুসারী নিয়ে কারবালার ময়দানে পৌঁছেন। ইয়াজিদের সেনাবাহিনী তাঁকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়, যা হোসাইন (রা.) প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ‘একজন পাপিষ্ঠ, জালিম, দুশ্চরিত্র লোকের হাতে বায়াত হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
এরপর ইয়াজিদের বাহিনী কারবালার মরুভূমিতে ইমাম হোসাইন ও তাঁর পরিবারের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। তিন দিন ধরে এক ফোঁটা পানি না পেয়ে শিশুদের কান্না, নারীদের আহাজারি এবং হোসাইন (রা.)-এর ধৈর্যের অপার দৃশ্য ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।
১০ মহররম অর্থাৎ আশুরার দিনে একে একে ইমাম হোসাইনের ৭২ জন সাথি, ভাই, সন্তান, ভ্রাতুষ্পুত্র এবং প্রিয়জন শহিদ হন। অবশেষে ইমাম হোসাইন (রা.)-কেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তার ছিন্ন মাথা পাঠানো হয় ইয়াজিদের দরবারে। এ মর্মন্তুদ ঘটনার বিবরণ শুনলে আজও চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে।
ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগ কেবল একটি ঘটনা নয়; বরং তা সত্য ও ন্যায়ের জন্য আত্মোৎসর্গের এক চিরন্তন আদর্শ। তিনি সংখ্যায় ছোট, কিন্তু মনোবলে অপরাজেয়। তাঁর বিপরীতে বিশাল সৈন্যদল, কিন্তু তিনি ন্যায়ের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে আত্মসম্মান ও বিশ্বাসের সঙ্গে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর এই ত্যাগ প্রমাণ করে, সত্য কখনো পরাজিত হয় না। কারবালার ঘটনা বিশ্ববাসীকে শিক্ষা দেয়, অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই হচ্ছে প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব। আত্মত্যাগ, ধৈর্য, সাহসিকতা, নেতৃত্ব, বিশ্বাস এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা, এসব গুণের এক অপূর্ব সমন্বয় হলো আশুরা।
আশুরা আমাদের জীবনে বিবিধ শিক্ষা দেয়। তন্মধ্যে কয়েকটি হলো-
১. সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকা : ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সংগ্রাম আমাদের শিক্ষা দেয়, জীবনের সব চ্যালেঞ্জের মাঝেও সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। সংখ্যায় ছোট হলেও ন্যায়ের পক্ষে অটল থাকাই মুসলিমের কাজ।
২. আত্মত্যাগের মহিমা : ইসলামে আত্মত্যাগ কেবল রক্তদান নয়, বরং নৈতিক দৃঢ়তা, ত্যাগের মানসিকতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সবকিছু বিলিয়ে দেওয়ার নাম। হোসাইন (রা.) এই আত্মত্যাগের সেরা উদাহরণ।
৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া : জালিম শাসকের বিরুদ্ধে মুখ না খুলে চুপ থাকা গুনাহ। হোসাইন (রা.) দেখিয়ে গেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ফরজ। ইয়াজিদের অন্যায় প্রথা মেনে নিলে ইসলাম ধ্বংস হয়ে যেত।
৪. ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল : কারবালায় তিন দিন পানির অভাবে শিশুদের কাতরতা সত্ত্বেও হোসাইন (রা.) ধৈর্য হারাননি। তিনি আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখেছিলেন। এ থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি, সংকটে আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই মুমিনের কাজ।
আশুরার দিনে রোজা রাখা সুন্নত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আশুরার রোজা বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়’ (সহিহ মুসলিম)। কিছু ভুল প্রথা আছে, যা আশুরার নামে পালন করা হয়, যেমন আত্মপীড়ন, মাতম, তাজিয়া মিছিল, নিজেকে রক্তাক্ত করা ইত্যাদি। ইসলামে এগুলোর কোনো অনুমোদন নেই। বরং এদিনে কুরআন তেলাওয়াত, দোয়া, দান-সদকা ও পরিবারে ভালো খাবার পরিবেশন করা সুন্নত।
আজকের বিশ্বে যখন অসত্য, জুলুম ও অন্যায়ের ছড়াছড়ি, তখন ইমাম হোসাইনের আদর্শ যেন আমাদের সামনে এক আলোকবর্তিকা। সত্য, ন্যায়, মানবতা, নৈতিকতা ও ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় হোসাইন (রা.) আমাদের চিরন্তন অনুপ্রেরণা।
ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবন তথা জীবনের সর্বক্ষেত্রে কারবালার শিক্ষা প্রযোজ্য। আত্মস্বার্থ ত্যাগ করে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো, শাসকের অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং মজলুমের পাশে দাঁড়ানো এই শিক্ষাগুলো আজকের মুসলমানদের জন্য অতি জরুরি।
আশুরা কেবল একটি ইতিহাস নয়, বরং তা একটি আধ্যাত্মিক বিপ্লব, ইসলামের চিরন্তন আদর্শ ও সত্য-ন্যায়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগ আমাদের শেখায় কীভাবে জীবনের কঠিনতম পরিস্থিতিতেও ইসলামি আদর্শ রক্ষা করতে হয়। এদিনে শুধু শোক প্রকাশ নয়, বরং আশুরার শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়ন করা জরুরি। তবেই কারবালার আত্মত্যাগ হবে সার্থক এবং আমরা হোসাইন (রা.)-এর আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে চলতে পারব। আল্লাহ আমাদের হোসাইনের শিক্ষা থেকে প্রেরণা নিয়ে চলার তাওফিক দিন, আমিন।
কলাম- সময়ের আলো 


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
৩৪ বছর পর পশ্চিমবঙ্গে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন

৩৪ বছর পর পশ্চিমবঙ্গে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন