১৯৬২ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া চীন-ভারত যুদ্ধ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে উত্তর-পূর্ব থেকে পশ্চিম হিমালয় পর্যন্ত। সীমান্ত নিয়ে তখন দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে। লাদাখের চুশুল ছিল সামরিকভাবে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। চুশুল বিমানঘাঁটি দখল করতে পারলে, ভারত থেকে লাদাখকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে চীনারা।
তাদের লক্ষ্য ছিল রেজাং লা দখল করা, তারপর চুশুল, শেষে লাদাখ। এত বড় সামরিক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে। কিন্তু সেটার পাহারায় ছিলেন মাত্র ১৩ কুমায়ুন রেজিমেন্টের ‘চার্লি কোম্পানির’ ১২০ জন সৈনিক। এই সৈনিকদের দায়িত্বে ছিলেন মেজর শয়তান সিং। ১৯২৪ সালে রাজস্থানের যোধপুরে জন্মানো শয়তান সিং ভাটি ছিলেন এক দৃঢ়চেতা সামরিক পরিবারের সন্তান। শৈশব থেকেই তিনি দেখেছেন সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ এবং দেশপ্রেমের নির্মম বাস্তবতা। তাঁর বাবা লেফটেন্যান্ট কর্নেল হেম সিং ভাটি ছিলেন এক কঠোর আদর্শের মানুষ, যিনি সন্তানকে শিখিয়েছিলেন ‘দেশের দায়িত্ব কখনও অর্ধেকভাবে পালন করা যায় না।’১৯৪৯ সালে কুমায়ুন রেজিমেন্টে কমিশন পেয়ে শয়তান সিং দ্রুতই হয়ে ওঠেন এক নেতা জওয়ানদের কাছে তিনি ছিলেন ‘সাহেব’, যে সাহেব সামনে থেকে যুদ্ধ করেন। যখন ১২০ জন জানত, মৃত্যু নিশ্চিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬,৪০০ ফুট ওপরে রেজাং লা। অক্সিজেন এত কম যে, হাঁটলেও হাঁপ ধরে যায়। খোলা মাটিতে রক্ষাকবচ নেই, বরফই একমাত্র দেয়াল। এ অবস্থায় প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু মেজর সিং সেই অসম্ভবকেও সম্ভব করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। সেনাদের সামনে তিনি একবারও ভয় দেখাননি; বরং বলেছিলেন ‘এই মাটি আমাদের মা। আমরা মরে গেলেও এ মাটি শত্রুকে দেব না।’
১৭ নভেম্বর রাত থেকেই চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা। তুষারের ওপর দিয়ে চীনা বাহিনী এগোচ্ছে। শহর, গ্রাম, বাড়িঘর– কিছুই নেই এত ওপরে। সেই নীরবতার মধ্যে শোনা যাচ্ছিল শুধু প্রতিরক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া ১২০ জন জওয়ানের শ্বাসপ্রশ্বাস। ২০ নভেম্বর ভোররাতে চীনা সেনারা তিন দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে। তাদের পাশেই ছিল আর্টিলারি সাপোর্ট, মর্টার, মেশিনগান। তাদের পাল্টা আক্রমণ করছে ভারতীয় সেনারা। যাদের কাছে ছিল সীমিত বুলেট, সীমিত অস্ত্র; কিন্তু মনোবল ছিল সীমাহীন। চীনারা তিন দফায় আক্রমণ চালায়। প্রতিবারই চার্লি কোম্পানি তাদের পিছু হটায়। তৃতীয় আক্রমণে হাতাহাতি লড়াই শুরু হলে ভারতীয় সেনারা বেয়নেট দিয়ে পাল্টা জবাব দেন। গোলাবারুদ শেষ হলেও যুদ্ধ থামেনি। অনেক জওয়ান গুলির বদলে হাত দিয়ে পাথর ছুড়ছিলেন, বেয়নেট দিয়ে শেষ পর্যন্ত লড়ছিলেন। এই যুদ্ধই পরে সামরিক ইতিহাসে পরিচিত হয় ‘লাস্ট ম্যান লাস্ট রাউন্ড বুলেট’ নামে।
খবর-সমকাল
নিউজ বাংলা চ্যানেল