সৈয়দ এম এ জিন্নাহ্ :: চিত্রা নদীর শান্ত তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে নড়াইল—ঐতিহ্য, ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য ও বীরত্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক। এই জেলার মাটি জন্ম দিয়েছে বিশ্ববরেণ্য শিল্পাচার্য এসএম সুলতানকে, যিনি বাংলা শিল্পের আকাশে এক অনন্য দীপশিখা। দিয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখকে, যাঁর ত্যাগ ও বীরত্ব জাতীয় মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরে প্রতিষ্ঠিত। এমন দুই মহান সন্তানের জন্মস্থান নড়াইলের মাটিতে উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামো আজও পিছিয়ে—এটাই বাস্তবতা। প্রশ্ন জাগে: এই গৌরবজনক মাটিতে উচ্চশিক্ষার আলো জ্বলতে এত বিলম্ব কেন?
নড়াইলবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি—এ জেলায় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা। দেশের উন্নয়নভূমিতে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের যে ধারা গত এক দশকে জোরদার হয়েছে, সেখানে নড়াইলের মতো ঐতিহ্যবাহী জেলা এখনো তার ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত। অথচ জেলার উন্নয়নগত অর্জন তাকে ইতোমধ্যেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
চিত্রা নদীর ওপর ১৪০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মিত হয়েছে, লোহাগড়া কলেজ সরকারি হয়েছে, কালনা সেতুর উদ্বোধন হয়েছে এবং বেনাপোল–যশোর–নড়াইল–লোহাগড়া হয়ে চার লেনবিশিষ্ট এশিয়ান হাইওয়ের রূপকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান—এসবই নড়াইলকে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের দোরগোড়ায় এনে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া কোনো অঞ্চলের প্রকৃত অগ্রগति সম্পূর্ণ হতে পারে না। দেশের ২৬ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪ থেকে ৩৮-এ উন্নীতকরণ, মেডিকেল কলেজের বিস্তার—এসবই সরকারের বৃহত্তর শিক্ষা দর্শনের প্রমাণ। তাহলে নড়াইলের ক্ষেত্রে এই দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখনো কেন গ্রহণ করা হয়নি?
জেলার সদর সংলগ্ন ঐতিহাসিক হাটবাড়িয়া জমিদার বাড়িতে সরকারের মালিকানাধীন ২৭ একর ভূমি রয়েছে—প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই জমির প্রতি স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে; ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসের উদ্দেশ্যে জমি দখলের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নড়াইলের সচেতন মহল মনে করছে—এই জমি এখনই রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি বিশাল সম্ভাবনা হারাবে।
অন্যদিকে, নড়াইল শহরের পূর্বে মালিবাগ এলাকায় ৫ একর সরকারি জমিতে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। জেলার স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, দক্ষ চিকিৎসক তৈরি এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা প্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধির জন্য একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা সময়োপযোগী ও অত্যন্ত জরুরি।
নড়াইল শুধু একটি জেলা নয়; এটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের এক মূল্যবান অধ্যায়। শিল্পাচার্য সুলতানের তুলি এবং বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের রক্তধারা এই মাটিকে করেছে সম্মানিত। সেই মাটিতে উচ্চশিক্ষার আলো জ্বলে উঠলে তা শুধু নড়াইল নয়, সমগ্র দেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। এই আলো জ্বালানোর দায়িত্ব সরকার ও রাষ্ট্রের।
আমরা মনে করি—নড়াইলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ স্থাপন আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। জাতীয় উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সমতার ন্যায্যতার বিচারে এখনই প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ। নড়াইলবাসীর প্রত্যাশা—যে মাটিতে সুলতানের শিল্প ও নূর মোহাম্মদের বীরত্ব জন্ম নিয়েছিল, সেই মাটিতেই উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে। সরকারের দ্রুত ও ইতিবাচক হস্তক্ষেপই পারে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক, সম্পাদক-নিউজ বাংলা চ্যানেল।
নিউজ বাংলা চ্যানেল