এনবিআরের পরিকল্পনায় আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার জন্য ‘ওয়ান এনবিআর’ কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিও রয়েছে। সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া উপস্থাপনায় সরকারি ব্যয়ের চাহিদা পূরণে এনবিআরের সক্ষমতা, কর-জিডিপি অনুপাতের ঘাটতি কমানোর পদক্ষেপ, সাংগঠনিক কাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
এনবিআর জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে শুধু করের হার বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। এ জন্য করদাতার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তি ও তথ্যের ব্যবহার বাড়ানো এবং কর পরিপালন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রূপরেখা অনুযায়ী, স্বল্প মেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মধ্য মেয়াদে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে এই অনুপাত ১৫ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রাজস্ব প্রশাসনে বিনিয়োগ, জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়ের সক্ষমতা বাড়ানো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং করদাতা সেবা উন্নয়নকে রাজস্ব বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে এনবিআর। উপস্থাপনায় জানানো হয়, সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ বর্তমানে এনবিআর থেকে আসে।
এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, রাজস্ব আহরণের প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়াতে কাজ জোরদার করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে এই সক্ষমতা উন্নয়ন এখন রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অধিকাংশ সময় ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে ছিল। ২০১১-১২ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মধ্যে অনুপাতটি প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছালেও পরবর্তী সময়ে তা আবার কমে যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। পরের অর্থবছর ২০২৫-২৬-এ তা বেড়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়ায়।
এনবিআরের দাবি, দক্ষিণ এশিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এই বাস্তবতায় ২০৩৫ সালের মধ্যে অনুপাতটি ১৫ শতাংশে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংসদীয় কমিটির সামনে দেওয়া উপস্থাপনায় গত ২৫ বছরের জিডিপির আকার, সরকারি বাজেট, রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয়, এনবিআরের রাজস্ব আহরণ ও প্রবৃদ্ধি, সরকারি ঋণ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর কর-জিডিপি অনুপাতের তথ্য বিশ্লেষণের কথা জানানো হয়। এসব পর্যালোচনার ভিত্তিতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের ক্ষেত্রগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনবিআরের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পর্যালোচিত সময়ে সরকারি ব্যয় ৪ দশমিক ৪৭ গুণ বাড়লেও এনবিআরের রাজস্ব আহরণ বেড়েছে ৩ দশমিক ৪০ গুণ। ফলে সরকারি ব্যয়ের বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব আহরণের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উপস্থাপনা অনুযায়ী, ২০০১-০২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত রাজস্ব প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকৃত রাজস্ব আয়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।
রাজস্ব প্রশাসনের তাৎক্ষণিক উন্নয়নের জন্য করদাতা সেবা, সুশাসন, নীতি প্রণয়নের সক্ষমতা, তথ্য ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছে এনবিআর।
প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনায় আইনি কাঠামো ও পরিবর্তনকালীন ব্যবস্থা পর্যালোচনা, সমন্বিত এন্টারপ্রাইজ আর্কিটেকচার তৈরি, প্রতিটি করদাতার জন্য পৃথক মাস্টার ডেটাবেজ এবং অভিন্ন ডেটা ডিকশনারি ও সিস্টেম ইনভেন্টরি তৈরির উদ্যোগ রয়েছে।
এর পাশাপাশি রাজস্বনীতি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, কর-ব্যয়ের রেজিস্টার প্রণয়ন এবং কোনো নীতির আর্থিক প্রভাব নির্ধারণে বাধ্যতামূলক টেমপ্লেট চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রথম তিন বছরের পরিকল্পনায় সমন্বিত করদাতা অ্যাকাউন্ট, গ্রাহক ও মামলা ব্যবস্থাপনার একীভূত ব্যবস্থা, তৃতীয় পক্ষের তথ্যের সঙ্গে করদাতার তথ্য যাচাই এবং বিভিন্ন করের ক্ষেত্রে পরিপালন ঝুঁকি শনাক্তের অভিন্ন ব্যবস্থা চালুর কথা রয়েছে। একই সময়ে কর পরিশোধ ও বকেয়া রাজস্বের সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
কাস্টমস ব্যবস্থায় বিশেষায়িত সীমান্ত কার্যক্রম বজায় রেখে আমদানি ও রপ্তানিকারকদের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে পণ্যের মূল্যায়ন এবং ভ্যাট ও আয়কর-সংক্রান্ত ঝুঁকির তথ্য সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছে এনবিআর।
পরবর্তী তিন থেকে পাঁচ বছরে প্রায় তাৎক্ষণিক কর পরিপালন বিশ্লেষণের ব্যবস্থা চালু, আইনি সুযোগ থাকলে আগে থেকে পূরণ করা কর রিটার্নের পরিধি বাড়ানো, কম ঝুঁকির ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ ফেরত এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়ার্ক ও জালিয়াতি শনাক্তে উন্নত বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনবিআর জানিয়েছে, রাজস্ব নীতির মাধ্যমে শিল্পোন্নয়ন ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়তা করা হবে। এর অংশ হিসেবে কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো, কৃষি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভ্যাট অব্যাহতি, বিভিন্ন খাতে কম আয়কর হার ও কর অব্যাহতি, কাস্টমস অটোমেশন এবং সিঙ্গেল-উইন্ডো সেবা চালুর উদ্যোগ রয়েছে।
রাজস্বনীতির আওতায় বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাওয়া খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষি, তৈরি পোশাক, রেফ্রিজারেটর ও এয়ারকন্ডিশনার, তথ্যপ্রযুক্তি, অটোমোবাইল ও বৈদ্যুতিক যানবাহন, মোবাইল ফোন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), পুঁজিবাজার, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা, ওষুধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি।
নিউজ বাংলা চ্যানেল