ঢাকা | খ্রি.

ঢাকায় ৬ রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবা চালু হচ্ছে ১ নভেম্বর

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 24, 2026 ইং | Photo Card
ঢাকায় ৬ রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবা চালু হচ্ছে ১ নভেম্বর ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর যানজট কমানো, বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ এবং গণপরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে আগামী ১ নভেম্বর থেকে ছয়টি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘এক কোম্পানি, এক রুট’ নীতির আওতায় নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট কোম্পানির বাস চলাচলের ব্যবস্থা করা হবে। পর্যায়ক্রমে ঢাকার বিদ্যমান বাস রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে নতুন এ উদ্যোগে যানজট ও পরিবহন বিশৃঙ্খলা কতটা কমবে, যাত্রীসেবার মানই বা কতটা উন্নত হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় নির্ধারিত বাসস্টপ, কাউন্টার ও ইলেকট্রনিক টিকিট চালুর পাশাপাশি জিপিএসের মাধ্যমে বাসের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা হবে। নির্ধারিত রুটের বাইরে অনুমোদনহীন বাস চলাচল বন্ধেও নেওয়া হবে ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত বাসসেবাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় এনে যাত্রী ওঠানামা, বাস চলাচল এবং সড়কে প্রতিযোগিতাজনিত বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত ৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাত কর্মদিবসের মধ্যে দুটি রুটে বাসসেবা চালু, দুই মাসের মধ্যে ৩২টি রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চূড়ান্ত এবং ছয় মাসের মধ্যে পুরো কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে ৬৬টি কোম্পানির প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বাস চলাচল করছে। অনুমোদিত ৪১৮টি রুটের মধ্যে বাস চলাচল করছে মাত্র ৯৮টি রুটে। একই সড়কে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচলের কারণে যাত্রী সংগ্রহে চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা, অনিরাপদভাবে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং যানজটের মতো সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে বিদ্যমান ৯৮টি রুটকে পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি রুটে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

যাত্রীদের ভোগান্তি কমানোর পরিকল্পনা

নতুন রুট বিন্যাস নির্ধারণে যাত্রীদের যাত্রা শুরুর স্থান ও গন্তব্যের ধরন জানতে ১০ হাজারের বেশি বাসযাত্রীর ওপর জরিপ চালানো হয়েছে। পাশাপাশি ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করেছে ডিটিসিএ। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত রুটের প্রায় ৭০ শতাংশ বর্তমান রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকবে। তবে কিছু যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছাতে মাঝপথে বাস পরিবর্তন করতে হতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে ছয়টি রুটে ৮১৬টি বাস চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি রুটে শীতাতপনিয়ন্ত্রণবিহীন এবং একটি রুটে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস চলবে। এসব রুটে বর্তমানে বিভিন্ন পরিবহন প্রতিষ্ঠানের অধীনে চলাচলকারী বাসগুলোকে পর্যায়ক্রমে একটি কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মশিউর রহমান জানিয়েছেন, শুরুতে ছয়টি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবা চালু করা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে দুটি থেকে তিনটি কোম্পানির বাস চলাচল করলেও পরে সেগুলোকে একটি কোম্পানির অধীনে আনা হবে। নতুন ব্যবস্থার বাসগুলো একই ধরনের হবে এবং বাসের রং করার কাজও শুরু হয়েছে।

পুরোনো বাসেই কি মিলবে উন্নত সেবা?

কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবা চালুর উদ্যোগের পাশাপাশি বাসের মান ও ফিটনেস নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। ফিটনেসবিহীন বাস বাদ দেওয়া হলে চলাচলের উপযোগী বাসের সংখ্যা কমে যেতে পারে। জরাজীর্ণ বাস মেরামত ও রং করার জন্য মালিকদের দুই মাস সময় দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু বাসের রং পরিবর্তন কিংবা কোম্পানির অধীনে পরিচালনা করলেই যাত্রীসেবার গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিত হবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ডিটিসিএর উপপরিবহন পরিকল্পনাবিদ ধ্রুব আলম বলেন, আগের উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাসমালিক সমিতিগুলোকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত না করা। অতীতে সরকার মালিক সমিতিগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় না করেই বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবার বিদ্যমান বাসগুলো যতটা সম্ভব মেরামত করে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে নতুন ব্যবস্থা চালুর পরও জরাজীর্ণ বাসে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অসুস্থ যাত্রীদের ওঠানামার দুর্ভোগ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাসে আসন না পেলে দাঁড়িয়ে কিংবা ভিড়ের মধ্যে বাসের গায়ে ঝুলে যাতায়াতের যে চিত্র রাজধানীর সড়কে দেখা যায়, তা কতটা বদলাবে—এ নিয়েও সংশয় রয়েছে। বাসের কাঠামো, ধারণক্ষমতা ও সামগ্রিক মানে পরিবর্তন না এলে কেবল পরিচালনব্যবস্থা বদলে যাত্রীদের প্রকৃত স্বস্তি কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

অবকাঠামো উন্নয়নে সময়সীমা

নতুন বাসসেবা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজের তালিকা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে ডিটিসিএ ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি)। এসব নির্মাণ ও মেরামতকাজ তিন মাসের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে রাজধানীর সব বাসস্টপেজ এখনো নির্ধারণ ও নির্মাণ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টরা। নির্ধারিত স্টপেজ থাকলেও সেখানে বাস না থামিয়ে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানোর প্রবণতা রয়েছে। ফলে বাসস্টপেজ নির্মাণের পাশাপাশি চালক ও পরিবহন পরিচালনাকারীদের আইন মানতে বাধ্য করা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

অনিয়ম ঠেকাতে অভিযান

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম বলেন, মহানগরীতে বাস চলাচলে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী গত ১১ অক্টোবর থেকে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন যৌথভাবে অভিযান শুরু করেছে।

ডিএমপির সহায়তায় রাজধানীর ১৭টি স্থানে অবৈধ ও বিশৃঙ্খলভাবে চলাচলকারী বাসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এতে ট্রাফিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে আইন অমান্যকারী বাসচালক ও পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে এসব স্থানে সপ্তাহের সাত দিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

সাইফুল আলম আরও জানান, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এখনো সব বাসস্টপেজ নির্ধারণ ও নির্মাণের কাজ শেষ করতে পারেনি। যেসব স্থানে স্টপেজ রয়েছে, সেখানেও বাস না থামিয়ে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে। স্টপেজ ছাড়া অন্য কোথাও বাস থামানো এবং যাত্রী ওঠানামা বন্ধের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীতে কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবা চালুর উদ্যোগ সফল করতে হলে শুধু রুট পুনর্বিন্যাস বা বাসের রং পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন বাসের ফিটনেস নিশ্চিত করা, নির্ধারিত স্টপেজে যাত্রী ওঠানামা বাধ্যতামূলক করা, চালকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করা, ইলেকট্রনিক টিকিট ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং নিয়মিত আইন প্রয়োগ।

একই সঙ্গে বাসমালিক, শ্রমিক, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় অতীতের মতো নতুন উদ্যোগও বাস্তবায়নের পর্যায়ে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে পারে।

রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে পরিকল্পনা কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং যাত্রীরা নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য পরিবহনসেবা পাচ্ছেন কি না, তার ওপর।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
টম হল্যান্ড-জেন্ডায়ার তিন দিনের বিয়েতে ব্যয় ৮ কোটি টাকা, সাজ

টম হল্যান্ড-জেন্ডায়ার তিন দিনের বিয়েতে ব্যয় ৮ কোটি টাকা, সাজ