নিউজ বাংলা ডেস্ক: চট্টগ্রাম বন্দরকে দেশের উত্তর, পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন ডুয়েলগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রায় ৫৯ দশমিক ৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বিদ্যমান মিটারগেজ রেলপথটি ডুয়েলগেজে রূপান্তর হলে একই লাইনে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ—দুই ধরনের ট্রেন চলাচল করতে পারবে। এর ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রামে রেল যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পণ্য পরিবহণ আরও সহজ ও দ্রুত হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে উত্তর, পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের রেল যোগাযোগ আরও কার্যকর হবে। পণ্য পরিবহণে সময় ও ব্যয় কমার পাশাপাশি সড়কপথের ওপর চাপও কমবে। শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি ও পর্যটন খাতে বিনিয়োগ ও কর্মকাণ্ড বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে বন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্প ও কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা আরও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় শুধু রেললাইন ডুয়েলগেজে রূপান্তর নয়, বিদ্যমান সেতু, কালভার্ট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, লুপ লাইন, লেভেল ক্রসিং, সিগন্যালিং ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নয়ন করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করা হবে। ফলে যাত্রী ও পণ্য—উভয় ধরনের রেল পরিবহণের সক্ষমতা বাড়বে।
তবে বড় অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে এর বাস্তবায়নে কিছু সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ, জলাবদ্ধতা, শব্দদূষণ এবং স্বাভাবিক চলাচলে প্রতিবন্ধকতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় জনগণের মতামত ও উদ্বেগ যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। নির্মাণকাজের সময় ধুলাবালি, শব্দদূষণ, বর্জ্য এবং গাছপালা ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব কমাতে কার্যকর পরিবেশ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। নিয়মিত পানি ছিটানো, শব্দ নিয়ন্ত্রণ, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের আশপাশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো গাছ কাটার প্রয়োজন হলে ক্ষতিপূরণমূলক বৃক্ষরোপণও নিশ্চিত করা জরুরি।
ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রচলিত আইন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি জমি, স্থাপনা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গাছপালা ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় নিতে হবে। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর গ্রিভ্যান্স রিড্রেসাল ব্যবস্থা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ রেলওয়ে, উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এ ব্যবস্থা পরিচালিত হলে জবাবদিহিতা বাড়বে।
চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন ডুয়েলগেজে রূপান্তর দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পণ্য পরিবহণের সক্ষমতা বাড়বে, লজিস্টিক ব্যয় কমতে পারে এবং সড়কপথের যানজট ও পরিবেশের ওপর চাপ হ্রাস পেতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প, কৃষি, পর্যটন ও বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তবে প্রকল্পের সাফল্য শুধু দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করার ওপর নির্ভর করবে না; পরিবেশ সুরক্ষা, ভূমি অধিগ্রহণে ন্যায়সংগত ক্ষতিপূরণ, স্থানীয় মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং নিয়মিত পরিবেশগত পর্যবেক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথ দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দেশের সামগ্রিক রেল ও পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল