সাম্প্রতিক পাঁচ বছরে বয়সভিত্তিক থেকে শুরু করে সিনিয়র পর্যায় পর্যন্ত স্পেনের সাফল্যের পরিসংখ্যান ঈর্ষণীয়। এই সময়ের মধ্যে তারা বিশ্ব ও ইউরোপিয়ান পর্যায়ে মোট ১৬টি শিরোপা জিতেছে। অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২০, অনূর্ধ্ব-২৩ এবং সিনিয়র—প্রতিটি স্তরেই স্প্যানিশ ফুটবলের ধারাবাহিক সাফল্য প্রমাণ করে, দেশটির ফুটবল কাঠামো কতটা শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।স্প্যানিশ ফুটবল বিশ্লেষক গিয়েম বালাগের মতে, এটি শুধু কয়েকটি শিরোপা জয়ের গল্প নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্যের প্রতিফলন। তার ভাষায়, স্পেনে এমন একটি ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে যেখানে খেলোয়াড়, কোচ এবং ফুটবল ফেডারেশন একই দর্শনে বিশ্বাস করে। তাই একটি সাফল্যের পর থেমে না গিয়ে তারা নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনে এগিয়ে চলে।
এই সাফল্যের অন্যতম স্থপতি জাতীয় দলের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার সময় তার নিয়োগকে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেছিলেন। কারণ এর আগে তিনি কোনো বড় ক্লাবের প্রধান কোচ ছিলেন না। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি স্পেনকে ২০২৩ সালে নেশনস লিগ, ২০২৪ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০২৬ সালে বিশ্বকাপ জিতিয়ে সব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন।
দে লা ফুয়েন্তের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল স্পেনের বয়সভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা। অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ এবং অলিম্পিক দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় বর্তমান জাতীয় দলের বেশিরভাগ ফুটবলারের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। ফলে সিনিয়র দলে এসে খেলোয়াড়দের নিয়ে নতুন করে বোঝাপড়ার প্রয়োজন হয়নি। স্পেনের সাবেক মিডফিল্ডার হুয়ান মাতার মতে, এই ধারাবাহিকতাই বর্তমান দলের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং ভবিষ্যতের জন্যও এটি দারুণ আশাব্যঞ্জক।বর্তমানে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে স্পেন টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত রয়েছে। ইউরোপ কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার কোনো জাতীয় দলই এর আগে এত দীর্ঘ সময় অপরাজিত থাকার নজির গড়তে পারেনি। মাঠে বল দখল, আক্রমণ গঠন এবং রক্ষণে শৃঙ্খলার দিক থেকে স্পেন এখন অন্য সবার জন্য অনুসরণীয় উদাহরণ।
নারী ফুটবলেও গত এক দশকে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। একসময় যেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব ছিল, সেখানে এখন উন্নত একাডেমি, বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা এবং পেশাদার অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। এর ফল হিসেবে নারী দলও বিশ্বকাপ ও নেশনস লিগে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করছে। সাবেক ফুটবলার মারিয়া গারিদোর মতে, গত কয়েক বছরে নারী ফুটবলে যে বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে, সেটিই আজকের সাফল্যের ভিত্তি।স্পেনের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। লামিন ইয়ামাল, পাউ কুবারসি, ভিকি লোপেজ এবং সালমা পারাইয়ুয়েলোর মতো তরুণ প্রতিভারা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। ইয়ামাল ও কুবারসি বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেই ইতিহাস গড়েছেন, যা স্পেনের ভবিষ্যৎ শক্তিমত্তারই ইঙ্গিত বহন করে।
ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক জো হার্টের মতে, বর্তমানে স্পেন যে ধরনের ফুটবল খেলছে, তার কাছাকাছিও বিশ্বের অন্য কোনো দল পৌঁছাতে পারেনি। একই সুরে ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরিও বলেছেন, স্পেনের সাফল্য কেবল প্রতিভাবান ফুটবলারের কারণে নয়, বরং শক্তিশালী ফুটবল কাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং প্রতিটি স্তরে উন্নয়ন নিশ্চিত করার ফল। সেই কারণেই বিশ্ব ফুটবলে স্পেনের আধিপত্য আরও অনেক বছর ধরে অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা।
নিউজ বাংলা চ্যানেল