মৎস্য বিভাগের তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীর নাব্যতা সংকট, দূষণ, ইলিশের প্রজনন পরিবেশের অবনতি এবং নির্বিচারে জাটকা ও মা-ইলিশ শিকারসহ বিভিন্ন কারণে কয়েক বছর ধরে মাছটির উৎপাদন কমছে। একই সঙ্গে কমেছে ইলিশের গড় আকার। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, একসময় ইলিশের গড় ওজন ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম থাকলেও বর্তমানে তা ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রামে নেমে এসেছে।
মৎস্য বিভাগের হিসাবে, বর্ষাকালই ইলিশের প্রধান মৌসুম। দেশে আহরিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও সাগর থেকে। তবে কয়েক বছর ধরে উৎপাদন বৃদ্ধির গতি কমে গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ৫ দশমিক ৩২ লাখ টন ইলিশ আহরণ করা হয়। পরের অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে ৫ দশমিক ৫০ লাখ টনে দাঁড়ায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা হয় ৫ দশমিক ৬৫ লাখ টন, ২০২১-২২ সালে ৫ দশমিক ৬৬ লাখ টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৭১ লাখ টনে পৌঁছে।
এর পর থেকেই উৎপাদনে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে নেমে আসে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে প্রায় পাঁচ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে।
উৎপাদনের পাশাপাশি ইলিশের আকার ছোট হয়ে যাওয়াও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান জানান, গত দুই বছরে ইলিশের সামগ্রিক উৎপাদনের সঙ্গে মাছটির গড় আকারও কমেছে। তাঁর মতে, আগে গড়ে ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রামে নেমেছে।
আনিসুর রহমানের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, নদীদূষণ, নাব্যতা সংকট এবং ইলিশের স্বাভাবিক প্রজনন পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার প্রভাব মাছটির ওপর পড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নদীর পরিবেশ রক্ষা এবং কার্যকর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, একটি ইলিশের ওজন এক থেকে দেড় কেজিতে পৌঁছাতে অন্তত দেড় বছর সময় প্রয়োজন। নদীতে ডিম থেকে জন্ম নেওয়া ইলিশের পোনা সাগরে যায় এবং পরিণত হওয়ার পর আবার মিঠাপানিতে ফিরে এসে ডিম ছাড়ে। কিন্তু অতিরিক্ত মাছ ধরার ফলে অনেক ইলিশ স্বাভাবিক জীবনচক্র সম্পন্ন করার সুযোগ পাচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, মোহনায় নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, বালু উত্তোলন, শিল্পকারখানার দূষণ এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি সাগরে ট্রলিং জাহাজে মা-ইলিশ ও জাটকা ধরার কারণেও বড় আকারের ইলিশের সংকট বাড়ছে। আইন অমান্য করলে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান থাকলেও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে বাজারে ছোট ইলিশের সরবরাহও কমে গেছে। দীর্ঘদিন হিমায়িত করে রাখা ইলিশ নতুন করে বাজারে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। সরবরাহের ঘাটতিকে কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো স্থানে ইলিশ বাড়তি দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।
খুলনার ময়লাপোতা সান্ধ্যবাজারে ইলিশ কিনতে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেন বলেন, এক কেজি ইলিশের জন্য ৩ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করার সামর্থ্য তাঁর নেই। তাঁর ভাষায়, বাঙালির প্রিয় ইলিশ এখন যেন শুধু রাজাদের খাবারে পরিণত হয়েছে।
স্কুলশিক্ষক সৌমেন অধিকারী বলেন, ইলিশের ভরা মৌসুমেও যদি দাম এত বেশি থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের পক্ষে এই মাছ কেনা কঠিন। বাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর তদারকিও দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ তাঁর।
খুচরা ব্যবসায়ীরা অবশ্য ইলিশের উচ্চমূল্যের পেছনে সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপ ও একাধিকবার হাতবদলকে দায়ী করছেন। তাঁদের দাবি, জেলেদের কাছ থেকে মাছ আহরণের পর খুচরা বাজারে পৌঁছানোর আগে কয়েক দফা হাতবদল হয়। প্রতিটি পর্যায়েই দাম বাড়ে। এর সঙ্গে দাদন, অতিমুনাফা, বরফ ও জ্বালানি তেলের বাড়তি ব্যয় যুক্ত হওয়ায় মাছ আহরণ ও বাজারজাতের খরচও বেড়েছে।
কিছু ব্যবসায়ী বেশি লাভের আশায় ইলিশ হিমায়িত করে রাখছেন। এক বিক্রেতা জানান, বর্তমান সরবরাহ সংকটের কারণে আগের বছরের সংরক্ষিত ‘হিম ইলিশ’ও বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।
বর্তমানে বাজারে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশের দাম ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। আর দেড় কেজি ওজনের ইলিশের দাম উঠেছে ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
দীর্ঘ সময় হিমায়িত করে রাখা ইলিশের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ছয় মাসের বেশি সময় ফ্রিজিং করে রাখলে মাছটির গুণগত ও পুষ্টিমান কমতে শুরু করে। দীর্ঘদিন সংরক্ষিত ইলিশ খেলে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে।
ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে সরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতেও। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) অধীনে সারা দেশে থাকা ২০টি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি বর্তমানে বন্ধ। আরও নয়টি কেন্দ্র সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
খুলনা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবারই সেখানে ইলিশের সরবরাহ সবচেয়ে কম। চলতি জুলাই পর্যন্ত ভরা মৌসুমে কেন্দ্রটিতে মাত্র দেড় হাজার কেজি ইলিশ এসেছে। অথচ ২০২২ সালের জুলাইয়ে সরবরাহ হয়েছিল ৩৮ হাজার ৫৪৬ কেজি, ২০২৩ সালে ১৫ হাজার ৯৭৬ কেজি এবং ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৩৯১ কেজি। দেশের অন্যতম বড় ইলিশের মোকাম বরগুনার পাথরঘাটাতেও এবার মাছের সরবরাহ কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নিঝুম দ্বীপ, নাফ নদীসহ ছয়টি এলাকা অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হলেও সেগুলো কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন—দুই ক্ষেত্রেই।
তাঁরা মনে করেন, জাটকা ও মা-ইলিশ শিকার পুরোপুরি বন্ধ করা গেলে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য মৎস্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি নিষিদ্ধ ট্রলিং বন্ধ, নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে যথাযথ প্রণোদনা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
নিউজ বাংলা চ্যানেল