রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের এক দিন পরই একই স্থানে পৃথক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দুই সংগঠন। এতে ক্যাম্পাসে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য সংঘাত ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাজহাট থানায় ১৪৪ ধারা জারির আবেদন করেছে। তবে মঙ্গলবার বেলা দুইটা পর্যন্ত তা কার্যকর করা হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, সোমবার বিকেলে ছাত্রশিবিরের আয়োজনে ‘জুলাই জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড (জুডিশিয়াল কিলিং) হিসেবে উল্লেখ করা কয়েকজন নেতার ছবি প্রদর্শন ও পরে তা সরিয়ে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ২৫ জন শিক্ষার্থী আহত হন। গুরুতর আহত পাঁচজন বর্তমানে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সোমবারের সংঘর্ষের প্রতিবাদে মঙ্গলবার বিকেলে ক্যাম্পাসের সামনে আবু সাঈদ চত্বরে পৃথক বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির।
মহানগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আবু সাঈদ চত্বরে আজ বিকেল ৪টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত আমাদের বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি আছে। সেখানে আমরা আমাদের মতো করে প্রস্তুতি নিয়ে থাকব। কেউ যদি হামলা করে, আমরা ছাড় দেব না।’
অন্যদিকে মহানগর ছাত্রশিবিরের প্রচার সম্পাদক সামছুল ইসলাম বলেন, ‘বেরোবিতে ছাত্রশিবিরের কর্মসূচিতে ছাত্রদলের সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে এবং গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। আমরা লালবাগ চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে আবু সাঈদ চত্বরে যাব।’
একই জায়গায় দুই সংগঠনের কর্মসূচি ঘিরে উদ্বেগ জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাঁদের আশঙ্কা, আবারও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে একদিকে যেমন শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হবে, অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়বে। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে সংঘাতের আশঙ্কায় তাজহাট থানায় ১৪৪ ধারা জারির আবেদন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ফেরদৌস রহমান। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, আগের রাতের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল বিক্ষোভ মিছিল এবং সভা-সমাবেশের কর্মসূচি দেওয়ায় ক্যাম্পাসের শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ক্যাম্পাসের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ১৪৪ ধারা জারিসহ সার্বিক সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
প্রক্টর ফেরদৌস রহমান বলেন, বর্তমানে ক্যাম্পাসের পরিবেশ শান্ত রয়েছে। বিকেলের কর্মসূচি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
তাজহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের কর্মসূচির বিষয়ে তারা অবগত হয়েছেন। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যাতে না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে এখনো ১৪৪ ধারা জারি করা হয়নি।
সংঘর্ষের ঘটনায় তদন্ত কমিটি
এদিকে সোমবারের সংঘর্ষের ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. শওকাত আলী বিষয়টি জানিয়েছেন।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাসুদ রানাকে। সহকারী প্রক্টর মো. আব্দুল্লাহ–আল–মাহবুবকে করা হয়েছে সদস্যসচিব। সংঘর্ষের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কমিটিকে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিজয় ২৪ হলের প্রাধ্যক্ষ মো. আমির শরীফ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. তানজিউল ইসলাম এবং রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. হারুন-আল রশীদ।
এর আগে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় সব ধরনের যানবাহন ও অতিথি প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। মঙ্গলবার সকালে প্রক্টর ফেরদৌস রহমান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ৪ আগস্ট থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসে অতিথি বা দর্শনার্থী, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারসহ সব ধরনের যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা চেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
নিউজ বাংলা চ্যানেল