
সৈয়দ
এম এ জিন্নাহ্ : বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে এস. এম. সুলতান এমন এক শিল্পী, যিনি
কেবল ক্যানভাসে রঙ মিশিয়ে ছবি আঁকেননি—তিনি তুলির মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন এক নতুন বাস্তবতা,
যেখানে বাংলাদেশের মাটি, মানুষ ও প্রকৃতি একাকার হয়ে গেছে। আজ ১০ অক্টোবর, এই মহান শিল্পীর ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৪ সালের এই দিনে তিনি চিরবিদায় নেন, রেখে যান এক অবিনাশী শিল্পঐতিহ্য।
১৯২৩
সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন শেখ মোহাম্মদ সুলতান। স্থানীয়ভাবে যিনি লাল মিয়া নামে পরিচিত। তিনি কেবল
শিল্পী নন, ছিলেন এক দার্শনিক—যিনি বিশ্বাস করতেন, “শিল্প মানুষের জন্য, সমাজের জন্য।”ছোটবেলা
থেকেই তিনি আঁকাআঁকিতে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। পরবর্তীতে কলকাতার গভর্নমেন্ট
আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়ে তিনি শিল্পের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেন। ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর তুলি
ও দৃষ্টিভঙ্গি আলোড়ন তোলে শিল্পমহলে। কিন্তু সুলতানের শিল্পশিক্ষা কেবল বিদ্যালয়ের
দেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না—তাঁর প্রকৃত পাঠশালা ছিল বাংলাদেশের গ্রাম, কৃষক, নদী ও মাঠ।
সুলতানের
চিত্রজগতে কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও প্রকৃতি ছিল মূল প্রেরণা। তাঁর আঁকা মানুষগুলো সাধারণ
নয়; তারা দৈত্যাকৃতি, বলিষ্ঠ ও প্রতীকী—যেন মাটির শক্তি, উৎপাদনের প্রতীক। তাঁর তুলি
বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক ও গ্রামীণ জীবনের শক্তি ও সৌন্দর্যকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে
ধরেছেন। তাঁর বিখ্যাত চিত্রগুলোর মধ্যে “কৃষকের শক্তি”, “নবান্ন”, “মহিষযাত্রা” এবং
“পল্লীর জীবন” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব চিত্রকর্মে তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের
প্রকৃত নায়ক হলো পরিশ্রমী কৃষক ও মেহনতি মানুষ।
এস. এম.
সুলতান ছিলেন নিভৃতচারী, সহজ-সরল ও সমাজসচেতন মানুষ। জীবনের শেষভাগে তিনি নড়াইলেই
স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। শিশুদের জন্য গড়ে তোলেন “নড়াইল শিশুস্বর্গ” নামের শিক্ষা
ও চিত্রচর্চার স্থান। শিল্প ছিল তাঁর কাছে কেবল সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়, বরং মানুষের
আত্মমর্যাদা ও জীবনের শক্তির প্রতীক। বলতে গেলে “তুলি ছিল তাঁর অস্ত্র, রঙ ছিল তাঁর ভাষা — আর
কৃষক ছিল তাঁর নায়ক।”
শিল্পকলায়
অসামান্য অবদানের জন্য তিনি একাধিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন। ১৯৮২ সালে একুশে পদক
এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে নড়াইলে
গড়ে তোলা হয়েছে “সুলতান কমপ্লেক্স” ও “সুলতান ফাউন্ডেশন”। প্রতিবছর সেখানে পালিত
হয় সুলতান মেলা, যা আজ দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।
আজ তাঁর
মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা স্মরণ করি এক এমন শিল্পীকে, যার শিল্প আমাদের শিখিয়েছে—“শ্রমই
শক্তি, প্রকৃতিই জীবনের উৎস। শিল্প শুধু চোখের আনন্দ নয়, এটি মানুষের মর্যাদার ভাষা।” সুলতানের
শিল্পচেতনা আজও আমাদের প্রেরণা জোগায় সত্য, সৌন্দর্য ও মানবতার পথে চলতে।
এস. এম.
সুলতান শুধু এক চিত্রশিল্পী নন; তিনি বাংলাদেশের মাটির আত্মা, মানুষের শিল্পরূপ এবং
চিরন্তন সৃষ্টিশক্তির প্রতীক। তাঁর তুলির টান আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শ্রমই সৌন্দর্য,
মানুষই শক্তি, প্রকৃতিই জীবনের চিরন্তন গান।
লেখক : গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও সম্পাদক, নিউজ বাংলা চ্যানেল(২৪ ঘণ্টা)