
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। হঠাৎ বেড়েছে মার্কিন ডলারের দাম। খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ১২৯ টাকায়। অন্যদিকে ব্যাংকিং চ্যানেলে আমদানি দায় পরিশোধে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১২৪ টাকা ৮০ পয়সা। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় খোলাবাজারে প্রতি ডলারে গ্রাহকদের অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ৪ টাকা ২০ পয়সা। ডলারের এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নতুন করে চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এদিকে খোলাবাজারে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে মানি চেঞ্জার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ১২৮ টাকা ১০ পয়সার বেশি দরে ডলার বিক্রির চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানাসহ কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে সংগঠনের এমন সতর্কবার্তার পরও খোলাবাজারে ১২৯ টাকায় ডলার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এতে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারিত বিনিময় হার কার্যকর করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যাংকারদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বৃদ্ধি এবং জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ব্যয়ের কারণে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। বিপরীতে রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স ও বিদেশি ঋণের অর্থছাড়ের প্রবাহ সেই অনুপাতে না বাড়ায় বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমদানি ব্যয়, পণ্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংকারদের মতে, ডলারের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ আমদানি দায় পরিশোধের বাড়তি চাপ। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলার আমদানি দায় পরিশোধের সময়সূচি অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে ডলার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে বাজারে ডলারের চাহিদা বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়লে একই পরিমাণ পণ্য আমদানিতেও আগের তুলনায় বেশি ডলার ব্যয় করতে হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা পরিচালনা ও পরিবহন খাত সচল রাখতে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখার প্রয়োজন থাকায় এ চাহিদা কমানোর সুযোগও সীমিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে জ্বালানি পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
একই সময়ে সামগ্রিক পণ্য আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। জুলাই-আগস্টে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে ব্যাংকগুলোর ডলারের প্রয়োজনও বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে সরবরাহ না বাড়লে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় খোলাবাজারে ডলারের দাম বেশি হওয়ার পেছনে নগদ বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও সরবরাহের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিদেশে ভ্রমণ, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নগদ ডলারের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে নগদ ডলারের সরবরাহ সীমিত হলে বিক্রেতারা বেশি দাম চাইতে পারেন।
বর্তমানে খোলাবাজারে ডলারের বিক্রয়দর ১২৯ টাকা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে ১২৪ টাকা ৮০ পয়সা। দুই বাজারের মধ্যে প্রতি ডলারে ব্যবধান ৪ টাকা ২০ পয়সা, যা ব্যাংকের দরের তুলনায় প্রায় ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেশি।
তবে ব্যাংকিং চ্যানেলের বিনিময় হার ও খোলাবাজারের নগদ ডলারের দর একই ধরনের লেনদেনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। ফলে দুই বাজারে কিছু ব্যবধান থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু এ ব্যবধান দীর্ঘস্থায়ী ও বড় আকার ধারণ করলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত দেয়।
ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে আসছে। এর উদ্দেশ্য বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে বিনিময় হারের ওপর চাপ কমানো। তবে আমদানি দায় পরিশোধের চাহিদা বেশি থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রির প্রভাব সাময়িক হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারের চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক ১২২ মিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। পরে আরও ১০০ মিলিয়ন ডলার বিক্রির জন্য নিলাম আহ্বান করা হলেও কোনো ডলার বিক্রি হয়নি।
অন্যদিকে, ২৬ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বা গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রিজার্ভ থেকে নিয়মিত ডলার বিক্রি করে বাজারের চাহিদা মেটানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। এতে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। বরং বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই বেশি জরুরি।
দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান সরবরাহ আসে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাত থেকে। এ দুটি খাতে আয় বাড়লে ব্যাংকগুলোর ডলার সংগ্রহের সক্ষমতাও বাড়ে। কিন্তু আমদানি ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধির বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে বাজারে সংকট তৈরি হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার এবং অক্টোবরে এসেছে ২ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রবাসী আয় বাড়লেও আমদানি দায় পরিশোধের বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
রপ্তানি আয়ও বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস। তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি খাত থেকে আয় বাড়লে ব্যাংকগুলোর ডলার সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ে। বিপরীতে রপ্তানি আয় কমে গেলে কিংবা দেশে অর্থ ফেরত আসতে বিলম্ব হলে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
ডলারের দাম বাড়লে আমদানিকারকদের একই পরিমাণ পণ্য কিনতে আগের তুলনায় বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়। বিশেষ করে জ্বালানি, ভোজ্যতেল, গম, চিনি, ডাল, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক পণ্য আমদানিতে ব্যয় বাড়তে পারে।
আমদানিকারকেরা বাড়তি ব্যয় পণ্যের বিক্রয়মূল্যে সমন্বয় করলে সরাসরি চাপ তৈরি হবে ভোক্তাদের ওপর। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন খরচও বেড়ে যেতে পারে। শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হলে উৎপাদিত পণ্যের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে রপ্তানিকারকেরা প্রতি ডলারের বিপরীতে বেশি টাকা পেতে পারেন। প্রবাসী আয় পাঠানো পরিবারের সদস্যরাও ডলার ভাঙিয়ে তুলনামূলক বেশি টাকা পান। তবে আমদানি-নির্ভর শিল্পের ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যমূল্য বাড়লে এ সুবিধার ইতিবাচক প্রভাব অনেকটাই সীমিত হয়ে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে ডলারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ডলারের দাম নির্দিষ্ট পর্যায়ে ধরে রাখার চেষ্টা করলে বাজারে প্রকৃত চাহিদা ও সরবরাহের প্রতিফলন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি হলে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রবাসী আয় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার উদ্যোগ জোরদার করা, রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি এবং অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসপণ্য আমদানিতে সতর্কতা প্রয়োজন। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সময়সূচি সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
সব মিলিয়ে খোলাবাজারে ডলারের দাম ১২৯ টাকায় ওঠা দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের জন্য নতুন সতর্কবার্তা। ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় খোলাবাজারে প্রতি ডলারে ৪ টাকা ২০ পয়সা বেশি দামে বিক্রি হওয়া বাজারের দুই অংশের মধ্যে ব্যবধানকে সামনে এনেছে। এ ব্যবধান কমিয়ে আনতে ডলারের সরবরাহ বাড়ানো, বৈধ চ্যানেলে লেনদেন উৎসাহিত করা এবং বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় ডলারের বাড়তি দাম আমদানি ব্যয় থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় পর্যন্ত নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।