
নিজস্ব প্রতিবেদক
তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের শিল্পাঞ্চল ও রাজপথ। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার আন্দোলনের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সড়ক অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শ্রমিক আন্দোলনের ব্যানারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতা। তাদের অভিযোগ, এ তৎপরতার নেপথ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু শিল্পমালিক, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রীও।
অন্যদিকে, চলমান অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের প্রশ্নে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ কীভাবে আবারও সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে? শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে কারা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে? আর সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই বা কেন সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না?
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, চলমান পরিস্থিতিতে ইতোমধ্যে ৬৭০টি পোশাক কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও জীবিকা অনিশ্চয়তায় পড়েছে, অন্যদিকে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতেও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু পোশাকশিল্প মালিকও অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে কাজ করছেন। শ্রমিকদের বিক্ষোভে কিছু শিল্পমালিক, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। সরকারের অন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং রাজনৈতিক নেতারাও শ্রমিক আন্দোলনের নেপথ্যে ষড়যন্ত্রের কথা বলেছেন।
এদিকে, পোশাকশ্রমিকদের প্রভাবশালী নেত্রী হিসেবে পরিচিত তাসলিমা আক্তার সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন, পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক দাবি ও আন্দোলনকে যেন কোনো মহল ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তার এ বক্তব্যে শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তৎপরতার মধ্যে পার্থক্য করার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শ্রমিকদের মজুরি ও অধিকারসংক্রান্ত দাবিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে তার সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হবেন শ্রমিকরাই। কারণ, কারখানা বন্ধ, উৎপাদন ব্যাহত এবং বিদেশি ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে কর্মসংস্থান ও দেশের অর্থনীতি উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগকে ঘিরে রাজনৈতিক সমঝোতা বা পুনর্মিলনের আলোচনা নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। বিরোধীদলীয় নেতার ‘আওয়ামী লীগকে মাফ করে দিয়েছি’ বক্তব্য এবং সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা রাজনৈতিক পুনর্মিলনের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের পরিবেশ তৈরির জন্য একে অপরের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলছেন।
সমালোচকদের অভিযোগ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি এখনো প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। অথচ দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একটি অংশ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে দূরে রয়েছেন। ফলে রাজনৈতিক পুনর্মিলনের আলোচনা ও বাস্তব ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে বৈপরীত্যের প্রশ্নও সামনে আসছে।
এদিকে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে ঘিরেও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। দলটির পলাতক নেতাকর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা এবং দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়ানোর আশঙ্কা করছেন অনেকে। তবে ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়টি আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতার সঙ্গে জড়িত। ফলে তার দেশে ফেরার ঘোষণার বাস্তবতা এখনো অনিশ্চিত।
দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা এবং রাজনৈতিক সংঘাতের অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে গোপালগঞ্জে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, স্থানীয় পর্যায়ে সংঘর্ষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত ৩১ অক্টোবর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের খুলনা লংমার্চ গোপালগঞ্জ অতিক্রমের সময় ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়ার ঘটনাও রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সব মিলিয়ে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি এখন কেবল শ্রমিক-মালিক বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় রাজনীতি, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক পুনর্মিলন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রশ্ন। তবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের তকমা দিয়ে উপেক্ষা করার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের দায় এড়ানোরও সুযোগ নেই।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সরকারের কাছে যদি অস্থিরতা সৃষ্টির নেপথ্যকারীদের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? কারখানা বন্ধ হয়ে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা যখন হুমকির মুখে, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি দোষারোপের পরিবর্তে প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়ন।
শ্রমিকের অধিকার রক্ষা, শিল্পের নিরাপত্তা এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে চলমান অস্থিরতা আরও গভীর সংকটে রূপ নিতে পারে।