
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়ন এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল দক্ষিণ কোরিয়া সফর করছে। সফরে প্রযুক্তি, আধুনিক শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সফরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, জাহাজ নির্মাণ, আধুনিক উৎপাদন শিল্প এবং হালকা প্রকৌশল খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তোলার বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। সফরকালে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন তাঁরা।
ইআরডি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সফরে দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান স্যামসাং, হানওয়া ওশান, নাভার, ইয়ংওয়ান, ফিউরিওসএআই এবং এলজি এআই রিসার্চের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া এসকে গ্যাস ও নাভারের সঙ্গে পৃথক বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রযুক্তি ও উন্নয়ন সহযোগিতার বিষয়ে কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (কোইকা) এবং কোরিয়া এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গেও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট (আইজিএনডি) উদ্যোগ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় ইআরডি পরিচালিত এই উদ্যোগের আওতায় পরিবহন, জ্বালানি, নগর সেবা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে সমন্বিত বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য উৎপাদন কেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল, শহর ও বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বারগুলোর মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করা। একই সঙ্গে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, ঢাকা ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে সংযোগ বাড়িয়ে রাজধানীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে নতুন প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪৫-৪৬ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রায় ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। সরকারি অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নের মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিপক্ষীয় পিপিপি প্ল্যাটফর্মের আওতায় অবকাঠামো খাতের বেশ কয়েকটি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রকল্পে দক্ষিণ কোরিয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ রয়েছে।
এদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নের সম্ভাবনা রয়েছে—এমন ১৭টি বরাদ্দবিহীন ও অননুমোদিত সরকারি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের কয়েকটিতে এডিবির সহ-অর্থায়নের সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে পরিবহন, পয়ঃনিষ্কাশন, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতের উদ্যোগ রয়েছে। এসব প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠন এবং অর্থায়নের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারিত হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ জনশক্তি গঠন এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে বিনিয়োগ প্রস্তাব চূড়ান্ত করা, প্রকল্পের অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং বাস্তবায়নের কার্যকর রূপরেখা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।