
নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্যথা কমানো থেকে শুরু করে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও হাড় ক্ষয় প্রতিরোধ—বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশ ডিওডেনামে পেপটিক আলসার হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ সেবন করলে আলসারের পাশাপাশি পাকস্থলী বা অন্ত্রে রক্তপাত, কিডনির ক্ষতি এবং অন্যান্য গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে পেপটিক আলসার বলতে পাকস্থলী অথবা ডিওডেনামের ভেতরের আবরণে সৃষ্ট ক্ষতকে বোঝায়। সাধারণত হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি (এইচ. পাইলোরি) নামের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের ব্যবহার এ রোগের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।
পেপটিক আলসারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ওষুধজনিত কারণ হলো নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস (এনএসএআইডি)। এ শ্রেণির ওষুধ ব্যথা ও প্রদাহ কমাতে ব্যবহৃত হয়। ন্যাপ্রোক্সেন, কেটোরোলাক, ডাইক্লোফেনাক ও এসিক্লোফেনাক এ শ্রেণির পরিচিত ওষুধ।
এসব ওষুধ পাকস্থলীর সুরক্ষামূলক আবরণ তৈরিতে ভূমিকা রাখা কিছু রাসায়নিক উপাদানের উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। ফলে পাকস্থলী ও ডিওডেনামের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আলসার এবং রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ে। বেশি মাত্রায় বা দীর্ঘদিন এসব ওষুধ সেবন করলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় সেবন করলেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ বিভিন্ন প্রদাহজনিত ও অটোইমিউন রোগসহ নানা সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ গ্রহণ করা বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে এনএসএআইডির সঙ্গে স্টেরয়েড ব্যবহার করলে পাকস্থলী বা অন্ত্রে আলসার ও রক্তপাতের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
এ ছাড়া কিছু অনিবন্ধিত বা অজানা উপাদানযুক্ত ওষুধে গোপনে স্টেরয়েড মেশানো থাকতে পারে। তাই হোমিওপ্যাথি, ইউনানি বা অন্য কোনো চিকিৎসাপদ্ধতির নামে বিক্রি হওয়া ওষুধের উপাদান ও নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে সেবন করা উচিত নয়। তবে সব ঐতিহ্যবাহী ওষুধে স্টেরয়েড থাকে—এমন দাবি সঠিক নয়।
স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকেরা নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে অ্যান্টিপ্লেটলেট ও অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্টজাতীয় ওষুধ ব্যবহার করেন। এসব ওষুধের মধ্যে অ্যাসপিরিন, ক্লোপিডোগ্রেল এবং বিভিন্ন অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট রয়েছে।
বিশেষ করে অ্যাসপিরিন পাকস্থলীর আবরণে ক্ষতি করতে পারে এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার কারণে আলসার থেকে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্য রক্ত পাতলা করার ওষুধও বিদ্যমান আলসার থেকে রক্তপাতের আশঙ্কা বাড়াতে পারে। তবে এসব ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করা উচিত নয়; কারণ এতে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বয়স বৃদ্ধি, হরমোনের পরিবর্তন এবং দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ব্যবহারের কারণে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয়ের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ, বিশেষ করে অ্যালেনড্রোনেট ও রাইসেড্রোনেটের মতো বিসফসফোনেট, ভুল নিয়মে সেবন করলে খাদ্যনালীতে প্রদাহ, ক্ষত এবং কখনো কখনো পাকস্থলী বা ডিওডেনামের সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
এ ধরনের ওষুধ চিকিৎসকের নির্দেশিত নিয়মে গ্রহণ করা জরুরি। ওষুধের ধরন অনুযায়ী সেবনের সময়, পানি পান এবং সেবনের পর নির্দিষ্ট সময় সোজা হয়ে বসে থাকা বা দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশনা মেনে চলতে হয়।
পেপটিক আলসার সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা করা না হলে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
রক্তবমি, কালো আলকাতরার মতো পায়খানা, হঠাৎ তীব্র পেটব্যথা কিংবা বারবার বমি হলে দ্রুত জরুরি বিভাগে যেতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যথা হলেই নিজের সিদ্ধান্তে ব্যথানাশক ওষুধ কেনা বা দীর্ঘদিন সেবন করা উচিত নয়। এসব ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে পেপটিক আলসারের পাশাপাশি কিডনির ক্ষতি এবং অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
কোনো ওষুধ সেবনের আগে রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, পূর্ববর্তী রোগ, অন্য ওষুধের ব্যবহার এবং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাই নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করা এবং নির্ধারিত মাত্রা ও সময় মেনে চলা জরুরি।
এ ছাড়া চিকিৎসকের পরিচয়, যোগ্যতা ও নিবন্ধন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত। কোনো চিকিৎসক বা বিক্রেতার পরামর্শে অজানা উপাদানযুক্ত ওষুধ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পাশাপাশি নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টের পরামর্শও সহায়ক হতে পারে।
সচেতনতা, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং ওষুধের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমেই পেপটিক আলসার ও এর সম্ভাব্য জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।