
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রভাব বা সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ফলাফল নির্ধারণের কোনো সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে জনসমর্থনসম্পন্ন ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের পাশাপাশি এখন থেকেই সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর মতে, দলীয় পরিচয়ের চেয়ে জনগণের কাছে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা এবং ভোটে জয়ী হওয়ার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম নগরীর হোটেল র্যাডিসন ব্লুতে বিএনপির এক সাংগঠনিক সভায় এসব কথা বলেন তারেক রহমান। সভায় চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় সাড়ে ৪০০ নেতাকর্মী অংশ নেন। সভাটি গণমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। পরে উপস্থিত দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সভার বিভিন্ন বিষয় জানা যায়।
সভায় উপস্থিত নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আসন্ন সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলের সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন বিএনপির চেয়ারম্যান। তিনি নেতাকর্মীদের এমন প্রার্থী নির্বাচনের আহ্বান জানান, যাঁদের স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এবং যাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সক্ষমতা রাখেন।
দলীয় নেতাদের বরাতে জানা যায়, তারেক রহমান নির্বাচনে অতীতের মতো দলীয় মনোনয়নকে বিজয়ের নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা না করার বিষয়ে গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রত্যাশা উঠে আসে। একই সঙ্গে নেতাকর্মীদের জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করার নির্দেশনা দেন তিনি।
সভায় স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে নেতাকর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতার পাশাপাশি সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে অপরাধ প্রতিরোধে উদ্যোগী হওয়ার নির্দেশ দেন।
তারেক রহমান বলেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে দলীয় নেতাকর্মীদের নিজেদেরও কোনো অপরাধে জড়ানো যাবে না বলে সতর্ক করেন তিনি।
সভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, নিজ নিজ এলাকার মাদক সমস্যা, চুরি, প্রতারণা ও অন্যান্য অপরাধ কমাতে স্থানীয় জনগণ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের আন্তরিক উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর না করে সামাজিকভাবেও অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃত শক্তি জনগণ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, রাজনৈতিক শক্তি ইতিবাচক ভূমিকা রাখলে সমাজের অনেক অনিয়ম ও অপরাধ কমানো সম্ভব। মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সভায় বর্তমান সরকারকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের গুজব ও অপপ্রচার মোকাবিলায় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে জানান উপস্থিত কয়েকজন নেতা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের নামে ছড়ানো বিভিন্ন তথ্যের বিষয়ে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে বলেন তারেক রহমান। পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম ও উদ্যোগ সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার নির্দেশ দেন তিনি।
বক্তব্যে বিএনপির নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম ও ত্যাগের কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, সভায় উপস্থিত নেতাকর্মীদের অনেকে গত ১৭ বছরে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং মামলা ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এরপরও তাঁরা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তারেক রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বিএনপির দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলেও ধারণা তৈরি হয়েছিল।
২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিএনপি প্রথমে আন্দোলন শুরু করে এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করে। একপর্যায়ে সেই আন্দোলন ছাত্র-জনতার ব্যাপক অংশগ্রহণে বিস্তৃত রূপ নেয়।
বর্তমান সরকারকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলে সভায় উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে অর্থনীতি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য খাতের সমস্যার কথা তুলে ধরেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, সরকারকে শূন্য থেকে নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে মাইনাস অবস্থান থেকে কাজ শুরু করতে হয়েছে। ধারাবাহিক পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রথমে সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং পরে অগ্রগতির দিকে এগোতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাংগঠনিক সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ। সভা সঞ্চালনা করেন মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান।
সভায় উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, নিতাই রায় চৌধুরী ও গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনসহ চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন পর্যায়ের দলীয় নেতা ও সংসদ সদস্যরা।
দলীয় নেতারা সন্ধ্যার আগেই সভাস্থলে উপস্থিত হন। তারেক রহমান রাত ১০টার দিকে নগরীর জে এম সেন হলের দুর্গাপূজার অনুষ্ঠান শেষে র্যাডিসন ব্লুতে পৌঁছান। সময় স্বল্পতার কারণে সভায় উপস্থিত নেতাদের অনেকেই বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাননি বলে জানা গেছে।
এর আগে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানাতে চট্টগ্রামের জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন তারেক রহমান। সামরিক বিমানযোগে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে রাজশাহী থেকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি।
জে এম সেন হল এলাকায় তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড় জমে। মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে তিনি মিছিলরত নেতাকর্মীদের সঙ্গে কিছু সময় হাঁটেন। পরে মোমিন রোড হয়ে চেরাগী পাহাড়ের দিকে গিয়ে গাড়িতে ওঠেন।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর গত ৯ আগস্ট প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম সফর করেন তারেক রহমান। ওই সফরে তিনি বাঁশখালী, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। সে সময় হোটেল র্যাডিসন ব্লুতেও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি।