
নিজস্ব প্রতিবেদন
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে হামলার আশঙ্কা, ইয়েমেনের এডেনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর এবং হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির অভিযোগ নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রিয়াদের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক স্থাপনা কিংডম সেন্টারের সব অফিসে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো ব্যবহারকারী মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
রোববার থেকে কার্যকর হওয়া নির্দেশনায় কিংডম সেন্টারের অফিসগুলোকে পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত নিজ নিজ কার্যক্রম বাসা থেকে পরিচালনা করতে বলা হয়েছে। ভাড়াটেদের কাছে পাঠানো এক ই-মেইল বার্তায় ভবনটির অফিস ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময়ে কর্মীদের অফিসে না আসার অনুরোধ জানিয়েছে। তবে ভবনটির নিচতলার শপিংমল খোলা রয়েছে।
রিয়াদের বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কিংডম সেন্টারকে ঘিরে এ সিদ্ধান্ত সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে হুথিদের সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে নিজ দেশের নাগরিকদের সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার জারি করা নিরাপত্তা সতর্কবার্তায় সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন মিশন জানিয়েছে, বিমানবন্দরে হামলা, আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়া, ফ্লাইট বাতিল এবং অন্যান্য ভ্রমণ বিঘ্নের আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন মিশনের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। অন্যদিকে জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু থাকলেও কয়েকটি ফ্লাইটের উড্ডয়ন ও অবতরণে বিলম্ব এবং বাতিলের ঘটনা ঘটছে।
সৌদি আরবের বিমানবন্দর দিয়ে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা মার্কিন নাগরিকদের যাত্রার আগে সতর্ক থাকতে এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা জেনে নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন হামলা এবং ফ্লাইটের সময়সূচি ও আকাশসীমার প্রাপ্যতায় আকস্মিক পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সৌদি সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষের মোবাইল ফোনে পাঠানো জাতীয় জরুরি সতর্কবার্তাগুলো অনুসরণ করতেও নাগরিকদের আহ্বান জানিয়েছে মার্কিন মিশন।
রিয়াদকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন রাজধানী এডেনে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। স্থানীয় ও সামরিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সরকারি প্রশাসনিক সদরদপ্তরের কাছাকাছি কৌশলগত এলাকায় প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। হামলার পর শহরজুড়ে সতর্কতা জারি করা হয় এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।
২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর থেকে এডেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে এ শহরে হামলার খবর সরকারের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে হামলায় হতাহত, ক্ষয়ক্ষতি এবং লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া এর পূর্ণাঙ্গ চিত্র নির্ধারণ করা কঠিন।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ পথ দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ফলে এ অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রিয়াদ ও এডেনকে ঘিরে হামলার খবর সত্য হলে তা ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পাশাপাশি সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক নৌপথের স্থিতিশীলতার ওপরও চাপ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে সীমান্ত, বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়লে সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসানে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে যে শান্তি আলোচনা ও সমঝোতার প্রচেষ্টা চলছিল, নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলা বাড়লে তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে এসব ঘটনার কারণে শান্তি উদ্যোগ পুরোপুরি ভেঙে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান ও পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এদিকে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান এলাকায় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটি সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে দুই ক্রু সদস্য নিহত হয়েছেন। রোববার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারটি ছিল এএইচ-৬আই মডেলের একটি গোয়েন্দা হেলিকপ্টার, যা সৌদি ন্যাশনাল গার্ড মন্ত্রণালয়ের অধীন ছিল। দেশটির ভূখণ্ডের ভেতরে নাজরান অঞ্চলে এটি বিধ্বস্ত হয়।
নিহত দুই কর্মকর্তার পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তুর্কি আল-মালিকি। তবে কীভাবে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিল এবং দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ কী, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগত চাপ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে চীন হুথিদের সহায়তা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক অনুসন্ধানমূলক সংস্থা কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা চীনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।
সংস্থাটির তথ্যমতে, হুথিরা ইরানের ‘খাইবার শেকান’ সিরিজের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের অন্তত কিছু অংশ নিজেরা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা এক হাজার কিলোমিটারের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণা সংস্থাটি হুথিদের উদ্দেশে পাঠানো সাম্প্রতিক কিছু চালানে বিশেষভাবে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ, কাঁচামাল, সরঞ্জাম ও পরীক্ষার যন্ত্রপাতি শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। এসব উপকরণের সঙ্গে পাওয়া নথিতে একজন চীনা সরবরাহকারীর নামও উল্লেখ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে সরবরাহকারীর নাম পাওয়া বা চীনা উৎসের যন্ত্রাংশ শনাক্ত হওয়ার তথ্য একাই চীনা সরকারের সরাসরি সামরিক সহায়তা প্রমাণ করে না। এ অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নে সরবরাহের প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং সরকারি পর্যায়ে কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিমানবন্দর ঘিরে নিরাপত্তা সতর্কতা, ইয়েমেনের এডেনে হামলার খবর এবং হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধির অভিযোগ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সামরিক পদক্ষেপ, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং শান্তি আলোচনার অগ্রগতির ওপর।