নিউজ বাংলা ডেস্ক : দুটি বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও টিকে থাকা ফ্রান্সের ঐতিহাসিক লিমোজ টাউন হল এবার দাঙ্গাকারীদের আগুনে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ১৪০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে জীবনযাত্রার ব্যয় ও আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ার পর। শনিবারের এ ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে আগামী ছয় মাসের মধ্যে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকার। প্যারিসের মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোয়ার জানিয়েছেন, মুখোশ পরা সশস্ত্র তরুণদের তাণ্ডবে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান ল্যকরনু শনিবার রাতে সহিংসতা ও সংঘর্ষের নিন্দা জানিয়ে বলেন, দেশজুড়ে এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১৫০ জন পুলিশ সদস্য, যাঁদের অবস্থা গুরুতর বলে জানানো হয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতিবিরোধী এ বিক্ষোভে সারা দেশে অংশ নেন অন্তত সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ। তবে কয়েকটি শ্রমিক ও শিক্ষার্থী সংগঠনের দাবি, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আট লাখ ছাড়িয়েছে। বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেন্ট-এতিয়েন শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি গ্রেনেড ১৭ বছর বয়সী এক তরুণের হাতে বিস্ফোরিত হয়। এতে তাঁর ডান হাত উড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
দিনভর সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে প্যারিস, মার্শেই, নিস, নানতেস, বর্দো, লিল ও লিমোজসহ বিভিন্ন বড় শহরে। মুখোশ ও গ্লাভস পরা কয়েকটি দল প্রথমে নিরাপত্তা ক্যামেরা অকার্যকর করে দেয়। এরপর কাচ ভেঙে সুপারমার্কেট, ফার্মেসি, বিলাসপণ্যের দোকান ও ইলেকট্রনিকসের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালানো হয়।
সহিংসতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় লিমোজ শহরে। সেখানে আগুনে পুড়ে প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় ১৪০ বছরের বেশি পুরোনো টাউন হলটি। এ ছাড়া মার্শেই ও লিলের টাউন হলেও হামলা চালানো হয়েছে। বর্দো শহরে একটি পুলিশ ফাঁড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং লিঁওতে একটি পর্যটন কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়।
সহিংসতার ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, সরকারি কার্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও টাউন হলে ভাঙচুর এবং লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।
আট বছর আগে ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়া ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সঙ্গে বর্তমান বিক্ষোভের মিল খুঁজে পাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপজুড়ে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে এবারের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিক্ষোভ চলাকালে বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ‘১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব ফিরে এসেছে’ এবং ‘বাস্তিল দুর্গ দখলের মতো টাউন হল দখল করো’—এমন স্লোগান দিতেও দেখা গেছে।
নির্বাচনের আগে এই অস্থিরতা ফ্রান্সের রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। চরম ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মারিন ল্য পেন সহিংসতার জন্য চরম বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশঁর দলকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, দলটি সহিংসতাকে বৈধতা দিয়েছে। অন্যদিকে, মেলঁশঁ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানালেও তাঁর সমর্থকদের লুটপাটে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।