নিউজ বাংলা ডেস্ক : দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নতুন প্রকল্প গ্রহণ, জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণ, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং জেলেদের সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ‘মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে ইলিশের টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে’ আইন প্রয়োগ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পে জেলেদের জন্য ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ) সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ ৪৬ হাজার করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে শুধু নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করলেই হবে না; নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও নাব্যতা বজায় রাখা, প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ, মোহনা ও উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণও জরুরি। এসব উদ্যোগের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে জেলেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের জীবিকার সুরক্ষাও সম্ভব হবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক ধারাবাহিকতার কারণে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের উৎপাদনে ওঠানামা হতে পারে। এ কারণে সাময়িকভাবে উৎপাদন কমে গেলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। সরকার নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে ইলিশ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, যা শিগগিরই চালু হওয়ার কথা।
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপপরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, আগের ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের’ মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। ‘মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে ইলিশের টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প’ অনুমোদন পেলে এর কার্যক্রম শুরু হবে। নতুন প্রকল্পে আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ, মোবাইল কোর্টের অভিযান, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং জেলেদের ভিজিএফ সহায়তা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
চলতি বছরও ইলিশ আহরণ তুলনামূলক কম রয়েছে বলে উল্লেখ করেন আবুল কালাম আজাদ। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুতন্ত্র এবং প্রাকৃতিক ধারাবাহিকতার প্রভাবে উৎপাদন কমে থাকতে পারে। তবে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের ফলে আগামী বছরগুলোতে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ইলিশ সংরক্ষণ শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়; এ ক্ষেত্রে সবার সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে এবং দীর্ঘ মেয়াদে জেলেরা এর সুফল পাবেন।
তিনি বলেন, ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ ও ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য। এর প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারের ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। নিষেধাজ্ঞার সময় কোনোভাবেই ইলিশ আহরণ করা যাবে না বলে তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মাসুদ রানা মনে করেন, ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। জাটকা আহরণ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা, ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার, নদীর নাব্যতা হ্রাস, পানিদূষণ, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপ—সব মিলিয়ে ইলিশের মজুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ ২৯ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছিল, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে উৎপাদন কমে প্রায় ৫ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কম। কয়েক বছর ধরে উৎপাদন বাড়ার পর এই পতন ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
ড. মাসুদ রানা আরও বলেন, সরকারি নথি অনুযায়ী, শিল্প ট্রলারের জন্য ৪০ মিটার গভীরতার বাইরে মাছ ধরার বিধান রয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে নির্ধারিত গভীরতা অঞ্চলের ভেতরে ট্রলিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, সূক্ষ্ম ফাঁসের বা অনুপযুক্ত জাল ব্যবহার করলে একই সঙ্গে ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের মাছ ধরা পড়ে। এতে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ প্রজননক্ষম হওয়ার আগেই আহরিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তাঁর মতে, উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি প্রজননক্ষম মা ইলিশ নদীতে ডিম ছাড়তে পারলে পরবর্তী প্রজন্মের বিপুলসংখ্যক ইলিশ জন্ম নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত টহল, নৌযান পর্যবেক্ষণ ও অভিযান চালাতে হবে। পাশাপাশি পানিদূষণ, বর্জ্য ফেলা, নাব্যতা কমে যাওয়া এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
ইলিশের প্রজনন ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে কোথায় ও কখন বেশি ডিম ছাড়ে এবং পরিবেশগত পরিবর্তন কীভাবে প্রজননে প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পরামর্শ দিয়েছেন ড. মাসুদ রানা। তাঁর মতে, সেসব তথ্যের ভিত্তিতেই ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত।
ইলিশের বিচরণ, প্রজনন ও নার্সারি ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে স্যাটেলাইট ও জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন ড. মাসুদ রানা। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, নদীর প্রবাহ, ক্লোরোফিলসহ বিভিন্ন পরিবেশগত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ইলিশের চলাচল ও সম্ভাব্য সমাগমের পূর্বাভাস দেওয়া যেতে পারে।
এ ছাড়া নদী ও মোহনায় ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) সেন্সরের মাধ্যমে পানির গুণগত মান তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ, ডিএনএ ও হাইড্রোঅ্যাকুস্টিক প্রযুক্তিতে ইলিশের উপস্থিতি ও মজুদ নির্ণয় এবং ড্রোন ও এআইভিত্তিক নজরদারির মাধ্যমে অবৈধ মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
তাঁর পরামর্শ, জিপিএসভিত্তিক নৌযান পর্যবেক্ষণ, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় স্মার্ট ফিশিং গিয়ার, ডিজিটাল ক্যাচ ডেটাবেজ এবং জলবায়ু পরিবর্তনভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এসব প্রযুক্তি সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে ‘স্মার্ট হিলসা ম্যানেজমেন্ট’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে ইলিশের প্রাকৃতিক মজুদ রক্ষা, অবৈধ আহরণ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই উৎপাদন বাড়ানো সহজ হবে।
ভারতের গুজরাট রাজ্যের নর্মদা নদীর মোহনা ও ভরুচ অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। ড. মাসুদ রানার মতে, গুজরাটে উৎপাদন বাড়ার সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিবৃষ্টির কারণে নর্মদা নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি, মোহনা অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিবর্তন, ইলিশের চলাচলের অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং মৌসুমি মাছের প্রাপ্যতা। এসব কারণ বুঝতে আরও গবেষণা এবং বাংলাদেশ ও গুজরাটের নদী-মোহনার পরিবেশের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা, তেঁতুলিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ নদী অববাহিকায় স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বজায় রাখা এবং মোহনা অঞ্চলের পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সমন্বিতভাবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে ইলিশের প্রজনন, চলাচল ও উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক মৎস্য ও অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল ওহাব বলেন, দেশে টানা দুই বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন কমছে। ২০১৬ সালে ৩ লাখ ৯৬ হাজার টন উৎপাদনের মধ্য দিয়ে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা শুরু হয়েছিল। এরপর প্রতি অর্থবছরে উৎপাদন ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টন করে বাড়ে। তবে গত দুই বছর ধরে সেই প্রবণতা উল্টো দিকে গেছে।
তাঁর মতে, বছরে সাড়ে ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ টন ইলিশ আহরণ করা গেলে তা টেকসই উৎপাদনের সীমার মধ্যে থাকবে। উৎপাদন কমার প্রধান দুটি কারণ হিসেবে তিনি প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা এবং নির্বিচারে জাটকা নিধনকে চিহ্নিত করেছেন।
অধ্যাপক আব্দুল ওহাব বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় অক্টোবরে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা এখনো যথাযথ রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নিষেধাজ্ঞার সময় কিছুটা পিছিয়ে নেওয়া প্রয়োজন কি না, তা গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে।
তিনি জানান, অতীতে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কয়েকটি পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রেখেছিল। এর মধ্যে ছিল মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, আট মাস জাটকা আহরণ বন্ধ রাখা, মার্চ ও এপ্রিলে অভয়াশ্রমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা, সাড়ে ৬ সেন্টিমিটারের কম ফাঁসের জাল নিষিদ্ধ করা এবং নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের চালসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া। ২০০৫ সালে পাঁচটি অভয়াশ্রমও নির্ধারণ করা হয়েছিল। বর্তমানে এসব অভয়াশ্রমের কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন ও সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক আব্দুল ওহাবের ভাষ্য, পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায় ইলিশ ডিম ছাড়ার পর মার্চ-এপ্রিলে জাটকাগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে সাগরের দিকে যেতে শুরু করে। এ সময় নদীতে নিষিদ্ধ জাল এবং উপকূলীয় সাগরে ৪০ মিটারের কম গভীরতায় মাছ ধরা আর্টিসানাল ট্রলার ব্যবহার করে ব্যাপকভাবে জাটকা নিধন করা হয়। ফলে ইলিশ পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় না। এ কারণে জাটকা নিধনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। নদী দখল ও দূষণে বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হওয়া এবং নাব্যতা সংকটও ইলিশের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা তৈরি করছে বলে জানান তিনি।
মৎস্যবিজ্ঞানীদের উদ্বেগের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় উপকূলের জেলেদের বক্তব্যেও। বিষখালী নদীতে মাছ ধরেন এমন জেলে মো. লিটন হোসেন, মো. কাইয়ুম ও নিরু খান জানান, ইলিশের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পরই ছাঁকনির মতো সূক্ষ্ম জাল দিয়ে সেগুলো ধরে ফেলা হয়।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাটকা নিধনের শুরুতে খুব ছোট ইলিশ স্থানীয় বাজারে ‘চাপিলা মাছ’ নামে বিক্রি করা হয়। পরবর্তী ধাপে তুলনামূলক বড় ফাঁসের কারেন্ট জালে নির্বিচারে মাছ ধরা হয়। এরপর বড় ট্রলিং ট্রলার ও কাঠের রূপান্তরিত ট্রলিং ট্রলারে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ বেহুন্দি জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ে। এতে মাছের পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগ নষ্ট হচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
জেলেরা জানান, চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা ছাড়াও নোয়াখালীর হাতিয়া, ভোলা ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ইলিশ ধরা হচ্ছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইলিশের খাদ্যতালিকায় ২৭ প্রজাতির প্রাণিকণা (জুপ্ল্যাংকটন) ও ১২ প্রজাতির উদ্ভিদকণা (ফাইটোপ্ল্যাংকটন) রয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মেঘনা নদীতে এসব প্ল্যাংকটনের পরিমাণ ৬৮ শতাংশ কমেছে। এর অন্যতম বড় কারণ হিসেবে নদীদূষণকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের গবেষণায়ও পদ্মা ও মেঘনার মোহনায় ইলিশের প্রয়োজনীয় খাদ্য প্ল্যাংকটন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী, খাদ্যের এই ঘাটতি ইলিশের আকারের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির পাশাপাশি উপকূলীয় জেলে ও মৎস্যনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া পরিবহন, বাজারজাতকরণ, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন এবং মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজে আরও প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়োজিত।
পুষ্টিগুণের দিক থেকেও ইলিশ গুরুত্বপূর্ণ। এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান, যা মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড স্টেট অব ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিঠাপানির মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। চাষের মাছ উৎপাদনে দেশটির অবস্থান পঞ্চম এবং ইলিশ আহরণে বাংলাদেশ প্রথম। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট ইলিশকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা দেশের জন্য গৌরবের বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন প্রয়োগ, মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ, নদীর পরিবেশ পুনরুদ্ধার, গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি একসঙ্গে কার্যকর করা গেলে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক মজুদ সংরক্ষণের পাশাপাশি এ সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।