
নিজস্ব প্রতিবেদক
ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে বড় ধরনের বিক্ষোভ মিছিল করেছেন হাজারো মানুষ। স্থানীয় সময় শনিবার (১০ অক্টোবর) মধ্য লন্ডনে আয়োজিত এ কর্মসূচি থেকে বিভিন্ন অভিযোগে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সমর্থনে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন, যুদ্ধ স্মৃতিসৌধে ক্ষতিসাধন, পুলিশের ওপর হামলা এবং বিক্ষোভের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ান ও আইটিভি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার দুপুরে ভিক্টোরিয়া এমব্যাংকমেন্ট এলাকায় জড়ো হন বিক্ষোভকারীরা। তাঁদের অনেকের পরনে ছিল ফিলিস্তিনের ঐতিহ্যবাহী কেফিয়েহ। হাতে ছিল ফিলিস্তিনের পতাকা এবং বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড। ‘গণহত্যা বন্ধ করো’ ও ‘ফিলিস্তিন মুক্ত করো’ স্লোগান দিয়ে তাঁরা ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজ হয়ে পার্লামেন্টের কাছের হোয়াইটহলে পৌঁছান। সেখানে গাজায় নিহত ফিলিস্তিনিদের স্মরণে দুই মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
বিক্ষোভের আয়োজক প্যালেস্টাইন কোয়ালিশনের দাবি, বিকেল নাগাদ কর্মসূচিতে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে অংশগ্রহণকারীর এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এর আগে মেট্রোপলিটন পুলিশ ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার মানুষের সমাগমের পূর্বাভাস দিয়েছিল। সেটি ছিল পুলিশের আগাম অনুমান, বিক্ষোভ শেষে নির্ধারিত উপস্থিতির সংখ্যা নয়।
বিক্ষোভকারীরা গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ এবং ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তাঁদের দাবি, গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান হামলা ও প্রাণহানি বন্ধে যুক্তরাজ্যকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
জাতিসংঘের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়া, আইনি মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মিছিলের পথে নিউ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তরের সামনে পাল্টা বিক্ষোভ করেন ইসরায়েলপন্থী সংগঠন স্টপ দ্য হেটের প্রায় ৩০ জন সদস্য। তাঁরা ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বিভিন্ন স্লোগান দেন। জবাবে বড় মিছিল থেকেও পাল্টা স্লোগান দেওয়া হয়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কায় পুলিশ দুই পক্ষের মধ্যে ধাতব ব্যারিকেড বসায় এবং অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করে। এতে দুই পক্ষকে আলাদা রাখা সম্ভব হয়।
মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ চলাকালে মোট ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজনের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সমর্থনে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ভিক্টোরিয়া এমব্যাংকমেন্টে অবস্থিত ব্যাটল অব ব্রিটেন স্মৃতিসৌধে উঠে ক্ষতিসাধনের সন্দেহে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিক্ষোভের নির্ধারিত শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় আরও সাতজনকে। তাঁদের মধ্যে দুজন পুলিশের নির্দেশে মুখ ঢাকার আবরণ খুলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
একজনকে নাৎসি স্যালুট দেওয়ার অভিযোগে এবং অন্য একজনকে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
বিক্ষোভের সময় ব্যাটল অব ব্রিটেন স্মৃতিসৌধের পাদদেশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের স্মরণে রাখা পপি ফুলের কয়েকটি মালা ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ইহুদি পরিবারের কয়েকজন সদস্য, যাঁদের স্বজন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় নিহত বা জিম্মি হয়েছিলেন।
হেইডি বাখরাম স্মৃতিসৌধে ক্ষতিসাধনের ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন।
এর আগে মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছিল, জনদুর্ভোগ ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা কমাতে মিছিলের পথ এবং সমাবেশের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের নির্ধারিত পথ অনুসরণ এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে কর্মসূচি শেষ করার শর্ত দেওয়া হয়। পরিচয় গোপন করার উদ্দেশ্যে মুখ ঢেকে রাখা ব্যক্তিদের আবরণ খুলতে নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও প্রয়োগ করে পুলিশ।
যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত হুসাম জোমলট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভের একটি ভিডিও শেয়ার করেন। তিনি বলেন, গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ব্রিটিশ জনগণের সংহতিও বাড়ছে।
প্যালেস্টাইন কোয়ালিশনের উদ্যোগে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে লন্ডনে ৩০টির বেশি বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। জোটটির অন্তর্ভুক্ত সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ক্যাম্পেইন, স্টপ দ্য ওয়ার এবং ক্যাম্পেইন ফর নিউক্লিয়ার ডিসআর্মামেন্টসহ আরও কয়েকটি সংগঠন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের কর্মসূচিগুলোর অধিকাংশই শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত ছিল। তবে কিছু বিক্ষোভে বিদ্বেষমূলক আচরণ এবং নিষিদ্ধ সংগঠনকে সমর্থনের অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলায় ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫০ জনের বেশি মানুষকে জিম্মি করা হয়। ওই ঘটনার পর গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার এক বছর পরও গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত ছিল। সংবাদমাধ্যমটির হিসাব অনুসারে, ওই এক বছরে গাজায় মৃতের মোট সংখ্যা আরও প্রায় ১ হাজার ৪০০ বেড়েছে।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ২৩০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন।
গাজা ও পশ্চিম তীরে চলমান সহিংসতা, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগের মধ্যেই লন্ডনের এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হলো।