
নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার
পর্যটননগরী কক্সবাজারকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে আরও এক ধাপ এগিয়েছে। বিদ্যমান কক্সবাজার পৌরসভাকে কেন্দ্র করে আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের নির্দিষ্ট এলাকা অন্তর্ভুক্ত করে নতুন সিটি করপোরেশন গঠনের প্রস্তাবের বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে জেলা প্রশাসন। প্রস্তাবিত সীমানা অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের আয়তন হতে পারে প্রায় ১৬৯ দশমিক ৬৪ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ধরা হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার।
জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তিতে কক্সবাজার পৌরসভার পাশাপাশি ঝিলংজা, খুরুশকুল, পিএমখালী, দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও খুনিয়াপালং ইউনিয়নের নির্দিষ্ট এলাকা অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব এলাকার ১২টি মৌজার বিস্তারিত বিবরণ এবং মৌজা ও দাগ নম্বরও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, কক্সবাজার পৌরসভার ৩২ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার, ঝিলংজার ২০, খুরুশকুলের ২৩ দশমিক ৬৭, পিএমখালীর ২৭ দশমিক ২৫, দক্ষিণ মিঠাছড়ির ১৮ এবং খুনিয়াপালংয়ের ৪৭ দশমিক ৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকা নতুন সিটি করপোরেশনের আওতায় আসতে পারে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের স্বাক্ষর করা ৩১ আগস্টের গণবিজ্ঞপ্তিটি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন-২ শাখার নির্দেশনা এবং স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) প্রতিষ্ঠা বিধিমালা, ২০১০-এর বিধি-৫-এর উপবিধি (২) অনুসরণ করে এ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।
গণবিজ্ঞপ্তিতে প্রস্তাবিত সীমানা বা অন্তর্ভুক্ত এলাকা নিয়ে কারও আপত্তি কিংবা মতামত থাকলে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিতভাবে জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর কোনো আপত্তি গ্রহণ করা হবে না।
কক্সবাজারকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার দাবি দীর্ঘদিনের। দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা, পর্যটকের চাপ এবং নগরায়ণের বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্তমান পৌরসভার নাগরিক সেবা কতটা কার্যকরভাবে দেওয়া সম্ভব—এ প্রশ্নও ক্রমেই সামনে এসেছে।
সিটি করপোরেশন হলে সড়ক যোগাযোগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের আশা, পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা গেলে পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে নাগরিকদের আর্থিক দায়ও বাড়তে পারে। হোল্ডিং ট্যাক্স, বিভিন্ন ফি ও অন্যান্য রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি সিটি করপোরেশনের আওতায় আসবে। ফলে সেবা বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হবে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেছেন, সিটি করপোরেশনের সীমানা নির্ধারণে কোনো একটি এলাকার স্বার্থকে এককভাবে বিবেচনা না করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থ, বিদ্যমান আইন-বিধিমালা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। নাগরিকদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তা সরকারের কাছে তুলে ধরা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
তার মতে, কোনো এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতায় এলে ওই এলাকার রাস্তা, অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার দায়িত্ব নতুন সংস্থার ওপর বর্তাবে। একই সঙ্গে কর ও বিভিন্ন ফি প্রদানের বিষয়ও যুক্ত হবে। তাই সিটি করপোরেশন গঠনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের আর্থিক সক্ষমতা ও দায়িত্বের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
সিটি করপোরেশন গঠনের উদ্যোগের মধ্যেই কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন নাগরিকদের একটি অংশ। তাদের বক্তব্য, কক্সবাজার পৌরসভা প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হলেও নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে এখনো নানা ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে সিটি করপোরেশন গঠন করলে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করার সক্ষমতা কতটা থাকবে, সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান এখনো বাস্তবায়িত না হওয়ায় নগর উন্নয়নের সামগ্রিক পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। কোথায় আবাসিক, বাণিজ্যিক বা পর্যটনকেন্দ্রিক উন্নয়ন হবে এবং পৌরসভা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের সীমারেখা কী হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট সমন্বয় প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাগরিকদের একাংশের মত, নতুন সিটি করপোরেশন গঠনের আগে বিদ্যমান পৌরসভার নাগরিক সেবা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে সমাধান করা জরুরি। পাশাপাশি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাস্টারপ্ল্যান দ্রুত প্রণয়ন এবং দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
প্রস্তাবিত সীমানায় ইউনিয়নগুলোর বিস্তীর্ণ এলাকা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে আবাদযোগ্য জমি, লবণ মাঠ, মৎস্যঘের ও কৃষিনির্ভর মানুষের জীবিকা নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে কীভাবে প্রভাবিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল মনে করেন, আলোচনা, যুক্তি-তর্ক এবং সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের ভিত্তিতেই প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশনের সীমানা চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। তার মতে, শুধু আয়তন বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা না করে সিটি করপোরেশনের আওতায় এলে কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের ব্যয় এবং জীবনযাত্রায় কী প্রভাব পড়বে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।
তিনি আরও বলেন, দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশনের সীমানাও একবারে বড় করা হয়নি; বিভিন্ন সময়ে পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। কক্সবাজারের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের মতামত বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষিজমি, লবণ উৎপাদন এলাকা, মৎস্যঘেরসহ স্থানীয় মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত সম্পদ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।
কক্সবাজারকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার উদ্যোগকে ঘিরে একদিকে যেমন উন্নত নাগরিক সেবা ও পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে কর-ফি বৃদ্ধি, ভূমি ও জীবিকার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং প্রশাসনিক সমন্বয় নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
ফলে শুধু প্রশাসনিক মর্যাদা পরিবর্তনের পরিবর্তে কক্সবাজারের দীর্ঘমেয়াদি নগর ব্যবস্থাপনা, আর্থিক সক্ষমতা, নাগরিক সেবা, পরিবেশ, পর্যটন এবং প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি উঠেছে।
গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এখন নাগরিকদের মতামত ও আপত্তি জানানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই মতামত, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই প্রস্তাবিত কক্সবাজার সিটি করপোরেশনের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারিত হবে।