
নিজস্ব প্রতিবেদন
হৃদযন্ত্র মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। শরীরের প্রতিটি কোষে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার এই অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গটি নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বয়স বাড়া কিংবা বংশগত হৃদরোগের ইতিহাসের মতো কিছু ঝুঁকি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলেও জীবনযাপন ও দৈনন্দিন অভ্যাসের মাধ্যমে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদরোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে প্রথমেই ধূমপান সম্পূর্ণভাবে পরিহার করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। ধূমপান রক্তচাপ বাড়ায়, রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা সৃষ্টি করে এবং হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। একই সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। ধূমপান ছাড়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই হৃদরোগের ঝুঁকি কমতে শুরু করে। দীর্ঘদিন ধূমপান থেকে বিরত থাকলে এ ঝুঁকি আরও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বুকে ব্যথাকে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে হাঁটা, দৌড়ানো কিংবা ব্যায়ামের সময় বুকে চাপ বা ব্যথা অনুভূত হলে তা হৃদরোগের সতর্ক সংকেত হতে পারে। বুকের ওপর ভারী কিছু চাপ দিয়ে রাখার মতো অনুভূতি, অতিরিক্ত ঘাম, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক অস্বস্তি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তবে খাবারের পর বুকে ব্যথা হলে তা কখনও কখনও হজমজনিত সমস্যার কারণেও হতে পারে। তাই উপসর্গের কারণ নির্ণয়ে চিকিৎসকের পরামর্শই সবচেয়ে নিরাপদ।
বংশগত কারণও হৃদরোগের অন্যতম বড় ঝুঁকি। মা-বাবা কিংবা নিকটাত্মীয়ের হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে সন্তানদের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পারিবারিক ইতিহাস থাকলেই হৃদরোগ অনিবার্য—এমন ধারণা ঠিক নয়। জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বিশেষ করে ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ গ্রহণ করলেও হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তবে কোনো ওষুধ নিজে থেকে শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হৃদরোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো হৃদরোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিগুলোর অনেক সময় কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ থাকে না। নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা ও ওজন পরীক্ষা করলে নীরব ঝুঁকিগুলো আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাও হৃদরোগের অন্যতম কারণ। দিনের অধিকাংশ সময় বসে বা শুয়ে কাটানো, নিয়মিত শরীরচর্চা না করা এবং অতিরিক্ত ওজন হৃদযন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিয়মিত ব্যায়াম রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, ওজন কমায়, শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক চাপ কমাতে ভূমিকা রাখে। যারা দীর্ঘদিন ব্যায়াম করেননি, তারাও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ধীরে ধীরে শরীরচর্চা শুরু করতে পারেন।
পেট ও কোমরের অতিরিক্ত মেদও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। কোমরের পরিধি বাড়তে থাকা, পেটের মেদ বৃদ্ধি কিংবা দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়াকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত পেটের মেদ বিপাকীয় নানা সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগ ও স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, উচ্চ রক্তচাপের অনেক রোগীর কোনো উপসর্গ থাকে না। ফলে নিয়মিত রক্তচাপ মাপা ছাড়া এটি শনাক্ত করা কঠিন। রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় দীর্ঘদিন থাকলে হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোকসহ গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে।
একইভাবে স্থূলতা হৃদযন্ত্রের জন্য বড় ধরনের হুমকি। অতিরিক্ত ওজন হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে এবং উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো হৃদরোগের ঝুঁকিগুলো বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা হৃদস্বাস্থ্যের সুরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
চিকিৎসকরা বলছেন, হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে আলাদা কোনো জটিল ব্যবস্থা সবসময় প্রয়োজন হয় না। ধূমপান বর্জন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ—এই কয়েকটি অভ্যাসই হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হৃদরোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।