নিউজ বাংলা ডেস্ক : লিওনেল মেসির বিদায় নিয়ে যখন ফুটবলবিশ্বের আলোচনা তুঙ্গে, তখনই পর্তুগাল জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়ার ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ বিবৃতি দিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ১০ পাতার বিবৃতিতে জাতীয় দলের কোচের সঙ্গে মতবিরোধ, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ, নিজের ভুল স্বীকার এবং সমর্থক-সতীর্থদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার বিষয় তুলে ধরেছেন ৪১ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার।
রোনালদো জানিয়েছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপের পর পর্তুগালের মানুষকে উদ্দেশ করে একটি বিদায়ী বার্তা আগে থেকেই প্রস্তুত করে রেখেছেন। তবে সেটি এখনো প্রকাশ করেননি। তার ভাষ্য, যখন সত্যিই জাতীয় দল ছাড়বেন, তখন সেই বার্তায় যা বলতে চান, সেটিই থাকবে।
রোনালদো জানান, বিশ্বকাপ শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার সময় পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাকে জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন। সভাপতি তাকে জানান, ফেডারেশন তাকে চায়। একই সময়ে বর্তমান জাতীয় দলের কোচ সম্পর্কে রোনালদোর মতামতও জানতে চান তিনি। রোনালদো তখন বলেন, তার মতে বর্তমান কোচই আদর্শ ব্যক্তি। কোচ হিসেবে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দিন তিনি খুশি হয়েছিলেন এবং পরবর্তী ফলাফলও সেই সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করেছে বলে উল্লেখ করেন।
কয়েক দিন পর নতুন কোচ প্রথমবার তাকে ফোন করে সরাসরি দেখা করতে চান। নির্ধারিত সময়ে ফুটবল শহরে তাদের সাক্ষাৎ হয়, যেখানে রোনালদোর ক্লাব প্রি-সিজন প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রোনালদোর দাবি, সেদিন কোচ তার ওপর আস্থা প্রকাশ করে জানান, তার প্রকল্পে রোনালদোর উপস্থিতি অপরিহার্য। পাশাপাশি একটি পরিকল্পনাও তুলে ধরেন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী রোনালদো প্রথম ও শেষ ম্যাচ খেলবেন এবং শারীরিক সক্ষমতার কথা বিবেচনা করে প্রতিটি ম্যাচে তিন-চারটি পরিবর্তন আনা হবে।
রোনালদো জানান, কোচ তাকে নরওয়ে ও ডেনমার্ক সফরে জাতীয় দলের সঙ্গে না গিয়ে প্রথম ম্যাচ খেলে পর্তুগালে থাকার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে দ্রাগাও স্টেডিয়ামের ম্যাচের আগে দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রোনালদো সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তার মতে, বিদেশের মাটিতে ম্যাচ না খেলা অধিনায়ক হিসেবে গ্রহণযোগ্য হলেও পর্তুগালে থেকে যাওয়া দলের জন্য ভালো দৃষ্টান্ত হতো না। শেষ পর্যন্ত কোচও তার যুক্তির সঙ্গে একমত হন।
এই আলোচনায় আল নাসরের স্পোর্টিং ডিরেক্টর সিমো কুতিনিও উপস্থিত ছিলেন বলে জানান রোনালদো। তার ভাষ্য, গত মৌসুমজুড়ে জাতীয় দলের বর্তমান কোচ তার কাছেই জবাবদিহি করতেন এবং ২০২৫ সালে ক্লাবটির কোচ হওয়ার ক্ষেত্রেও কুতিনিওর ভূমিকা ছিল।
প্রশিক্ষণ ক্যাম্প শুরুর আগের দিন কোচ রোনালদোর লিসবনের বাসায় গিয়ে আবার আলোচনা করেন। রোনালদোর দাবি, সেই বৈঠক শান্তিপূর্ণ ছিল এবং আগস্টে যে নীতিগুলোতে তারা একমত হয়েছিলেন, সেগুলোই বহাল ছিল। এরপর তিনি আলভালাদে স্টেডিয়ামের ম্যাচে খেলেন। বদলি হওয়ার পর ব্রুনো ফার্নান্দেজের হাতে নিজেই অধিনায়কের আর্মব্যান্ড তুলে দেন। তখন জাতীয় দলের হয়ে সেটিই তার শেষ কয়েকটি মুহূর্ত হতে পারে—এমন চিন্তা তার মাথায় আসেনি বলেও জানান রোনালদো। তার কাছে সেদিন দলের জয়ই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে নরওয়ের ম্যাচের দিন পরিস্থিতি বদলে যায় বলে রোনালদোর দাবি। দুপুরের খাবারের সময় কোচের সহকারী এসে তাকে জানান, কোচ তার সঙ্গে কথা বলতে চান। এরপর কোচ তাকে ৩০ মিনিট খেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। রোনালদো তখন শারীরিক পুনরুদ্ধার ও প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন এবং মনে করেছিলেন ওই ম্যাচে খেলবেন না।
তার ভাষ্য, কোচের এই অনুরোধ তার নির্ধারিত শারীরিক পুনরুদ্ধার ও প্রশিক্ষণ পরিকল্পনার বাইরে ছিল। কারণ মাসের চার তারিখে দ্রাগাও স্টেডিয়ামে ম্যাচ খেলার পরিকল্পনা ছিল। তবু তিনি কোচের প্রস্তাবে রাজি হন।
এরপর বিরতির পর রোনালদো ওয়ার্ম-আপ শুরু করেন। সময় পেরিয়ে গেলেও তাকে মাঠে নামানো হয়নি। রোনালদোর অভিযোগ, কোচ তার দেওয়া কথা রাখেননি।
তিনি বলেন, ম্যাচের পর শুধু সবকিছু জয় দিয়ে শেষ করতে এবং একা থাকতে চেয়েছিলেন। এ কারণে সমর্থকদের অভিবাদন জানাতে যাননি। নিজের এই আচরণকে ভুল উল্লেখ করে পর্তুগালের সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চান তিনি। যারা তাকে দেখতে মাঠে গিয়েছিলেন, পর্তুগিজ না হলেও তাদের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন রোনালদো।
দুই দিন পর কোচ ও সিমো কুতিনিওর সঙ্গে তার দীর্ঘ ও খোলামেলা আলোচনা হয়। রোনালদোর দাবি, তারা সম্মত হয়েছিলেন যে কোচ সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টির সত্যতা তুলে ধরে ঘটনার সমাপ্তি টানবেন। সেখানে কোচ বলবেন, রোনালদো কয়েক মিনিটের জন্যও খেলতে চাননি—এমনটি সত্য নয়; বরং প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের পরিকল্পনা তিনিই করেছিলেন। রোনালদোকে মাঠে না নামিয়ে শুধু ওয়ার্ম-আপ করানো ভুল হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমনটি আর করবেন না বলেও জানাবেন।
রোনালদোর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকের শেষে কোচ তাকে আলিঙ্গন করেন এবং সংবাদ সম্মেলনেও একই কথা বলার প্রতিশ্রুতি দেন। ঠিক হয়, রোনালদো ডেনমার্কে খেলবেন না, তবে দ্রাগাও স্টেডিয়ামের ম্যাচে অংশ নেবেন। পুরো আলোচনাতেই সিমো কুতিনিও উপস্থিত ছিলেন।
পরবর্তীতে কোচের অনুরোধে তার সঙ্গে সিমো কুতিনিও ও তিয়াগো ক্রাভেইরোর একটি ভিডিও বৈঠক হয়। আলোচনার সারসংক্ষেপ লিখিতভাবেও তৈরি করা হয়। রোনালদো জানান, তিনি সেটি অনুমোদন করে কোচের হাতে দেন। কিন্তু পরবর্তী বৈঠকে কোচের আচরণ আগের আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, সেখানে এমন কিছু কথা ও আগ্রাসী আচরণ করা হয়, যা তার কাছে অযৌক্তিক মনে হয়েছে।
রোনালদো এরপর কোচের তৈরি করা নোটের কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন। সেখানে বলা হয়, জাতীয় দলের এই মৌসুমের জন্য রোনালদোকে নিয়ে পরিকল্পনাটি কোচ নিজেই করেছিলেন। জাতীয় দলের প্রতি রোনালদোর ভালোবাসা এবং গত ২৪ বছর ধরে দলের ওপর তার ইতিবাচক প্রভাবের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। রোনালদোর জন্য প্রস্তাবিত পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল এবং তিনি কোচের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি বলেও সেখানে বলা হয়।
নোটে আরও বলা হয়, নরওয়ের ম্যাচটি রোনালদোর পরিকল্পনায় ছিল না। তবে কোচ মনে করেছিলেন, প্রথম ম্যাচ থেকে তিনি শারীরিকভাবে সেরে উঠেছেন এবং তাকে মাঠে নামানোর প্রয়োজন হতে পারে—এমন সতর্কতাও দেওয়া হয়েছিল। রোনালদো এতে সম্মত হয়েছিলেন।
কোচ আরও স্বীকার করেন, পেলে বা ম্যারাডোনার মতো খেলোয়াড়কে মাঠে না নামিয়ে শুধু ওয়ার্ম-আপ করানো তার ভুল এবং এমন পরিস্থিতি আবার হলে তিনি তা করবেন না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, রোনালদোকে জাতীয় দলে তিনি চান এবং আল নাসরেও যেমন তার ওপর আস্থা রেখেছিলেন, এখানেও সেই আস্থা রয়েছে।
সমর্থকদের অভিবাদন না জানানোর বিষয়টিও ওই নোটে উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, ২৩০টির বেশি ম্যাচ জাতীয় দলের হয়ে খেলা রোনালদোকে পর্তুগালকে ভালোবাসার বিষয়ে কারও কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হয় না। সেটি ছিল হতাশার মুহূর্ত। তিনি সমর্থকদের প্রতি সবচেয়ে বেশি অটোগ্রাফ, সেলফি ও স্নেহ দেখানো খেলোয়াড়দের একজন বলেও উল্লেখ করা হয়। তবে রোনালদোর দাবি, ওই নোটে কোচ তার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন—এমন কোনো উল্লেখ ছিল না।
রোনালদো বলেন, এটি ছিল কোচের দ্বিতীয়বার কথা না রাখার ঘটনা। তাই আর কোনো প্রতিশ্রুতির অপেক্ষা না করে তিনি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার কাছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সত্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সত্য যত কঠিনই হোক, সেটিই তাকে বলা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
রোনালদোর দাবি, সংবাদ সম্মেলনের দিন সকালে ফেডারেশনের সভাপতি ও কোচের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। তখন তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তারা যদি তাকে দলে না চান, তাহলে যেন সরাসরি তা জানিয়ে দেন। এমন সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তিনি ভবিষ্যতে দলের জন্য ভালো কিছু করার প্রতিশ্রুতিও দিতেন। কিন্তু তারা দুজনই তাকে জানিয়েছিলেন, জাতীয় দলেই তার জায়গা রয়েছে।
রোনালদো আরও বলেন, প্রায় ২৫ বছরের ক্যারিয়ারে জাতীয় দলের কোনো কোচ বা কর্মকর্তার কারিগরি কিংবা কৌশলগত সিদ্ধান্তে তিনি কখনো হস্তক্ষেপ করেননি। ভালো বা খারাপ—তারা যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তিনি তা মেনে নিয়েছেন এবং সম্মান করেছেন। কিন্তু দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখা না হলে সেখানে নিজের জায়গা আছে বলে মনে করেন না তিনি।
প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার জন্য জাতীয় দলের সতীর্থদের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন রোনালদো। তিনি স্বীকার করেছেন, কোচের ওপর আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হলেও এভাবে ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়া তার উচিত হয়নি। এই সিদ্ধান্তের দায়ও তিনি নিজের ওপর নিয়েছেন।
পর্তুগালের মানুষের কাছেও আবার ক্ষমা চেয়ে রোনালদো বলেন, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ঘটনা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তার মনে হয়েছিল, এরপর জাতীয় দলের সঙ্গে থাকা দলেরই ক্ষতি করবে। তাই তিনি নিজের ব্যাগ গুছিয়ে চলে যান।
নিজের এই সিদ্ধান্তের জন্য পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের কাছ থেকে শাস্তি পাওয়ার কথাও বলেছেন রোনালদো। তার মতে, শাস্তি কমানো উচিত নয়। কারণ তিনি শুধু একজন সাধারণ খেলোয়াড় নন, দলের অধিনায়কও। নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেও প্রতিটি কাজের পরিণতি থাকে এবং ফুটবলে সবার জন্য নিয়ম সমান হওয়া উচিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিদায়ী ম্যাচ নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে রোনালদো জানান, ফেডারেশন তাকে সম্মানজনক বিদায়ের সুযোগ দিতে চায়—এমন কথা তিনি শুনেছেন। তবে জাতীয় দলের ক্ষেত্রে তিনি বিদায়ী ম্যাচের চেয়ে প্রতিযোগিতাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, জীবনের কঠিন সময়েও জাতীয় দলের দায়িত্বকে গুরুত্ব দিয়েছেন। বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার দিনও তিনি জাতীয় দলের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ছিলেন এবং পরের দিনের ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দেশের জন্য তিনি সেদিন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা কোনো ক্লাবের ক্ষেত্রে করতেন না।
শেষে রোনালদো জানান, শারীরিকভাবে ফিট থাকলে এবং ক্লাবের হয়ে খেলতে ও গোল করতে পারলে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আগের মতোই জাতীয় দলের হয়ে লড়াই করতে প্রস্তুত থাকবেন।
তার ভাষায়, ‘বিশ্বাস করুন, এটাই চূড়ান্ত সত্য।’
—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো