
নিজস্ব প্রতিবেদন
দুই দশকের বেশি সময়ের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে ইরাক থেকে প্রত্যাহার সম্পন্ন করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান শুরুর পর দীর্ঘ ২৩ বছরেরও বেশি সময়ের ব্যবধানে দেশটিতে মার্কিন বাহিনীর সরাসরি সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটল। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে বিজয় হিসেবে দেখছে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। তবে এ পদক্ষেপের ফলে ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে শূন্যতা তৈরি হওয়া, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বৃদ্ধি এবং ইসলামিক স্টেটের (আইএস) পুনরুত্থানের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ইরাকের অবশিষ্ট সামরিক ঘাঁটিগুলো থেকে মার্কিন বাহিনীর শেষ সদস্যরা প্রত্যাহার করেন। এর মধ্য দিয়ে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। এ উপলক্ষে ইরাক সরকার ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে ২০২৪ সালেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকের মধ্যে সমঝোতা হয়। ওই সমঝোতা অনুযায়ী, ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশন ধাপে ধাপে শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ইরাকের অধিকাংশ এলাকা থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। সর্বশেষ উত্তরাঞ্চলের কুর্দি এলাকায় অবস্থানরত অবশিষ্ট সেনাদেরও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
গত ১২ আগস্ট ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি ৩০ সেপ্টেম্বরকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক মিশন সমাপ্তি ও সেনা প্রত্যাহারের ‘নির্ধারিত ও চূড়ান্ত’ সময়সীমা হিসেবে ঘোষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি এ ঘোষণা দেন। ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছিল, ১ অক্টোবর থেকে ইরাক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করবে এবং দেশটিতে বিদেশি সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটবে।
সামরিক জোটের পরিবর্তে এখন দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে ইরাক। নতুন ব্যবস্থায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াই এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান দায়িত্ব পালন করতে হবে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী ও কুর্দি অঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনীকে। ফলে মার্কিন সেনাদের সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াই সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইরাকি বাহিনীর সক্ষমতার পরীক্ষা শুরু হচ্ছে।
২০০৩ সালের ১৯ মার্চ ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট। ওই অভিযানে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তী সময়ে ইরাকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা বেড়ে এক লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তবে দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির পর ২০১১ সালের ডিসেম্বরে শেষ মার্কিন যুদ্ধসেনারা ইরাক ত্যাগ করেন।
এরপর ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের উত্থান ও ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলের পর দেশটির সরকারের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট আবারও ইরাকে সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলে। আইএসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা, ইরাকি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সামরিক সহায়তা প্রদান ছিল এ মিশনের মূল লক্ষ্য। দীর্ঘদিন ধরে চলা অভিযানের ধারাবাহিকতায় আইএসের ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে গোষ্ঠীটির অবশিষ্ট তৎপরতা এখনো ইরাকের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ।
এদিকে ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনীর বিদায়কে নিজেদের দীর্ঘদিনের দাবির বাস্তবায়ন ও বিজয় হিসেবে দেখছে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। দেশটিতে বিদেশি সামরিক উপস্থিতির বিরোধিতা করে আসা এসব গোষ্ঠী মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থানের সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছে। অন্যদিকে, ইরাকি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহারের পর দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি ইসলামিক স্টেটের পুনর্গঠিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মার্কিন সামরিক সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য ও নজরদারির সক্ষমতা কমে গেলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আইএসের তৎপরতা মোকাবিলা কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলেও উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে ইরাকের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর ওপর বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
তবে গত কয়েক বছরে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযানের মধ্য দিয়ে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। দেশটির সেনাবাহিনী, সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা এখন আগের তুলনায় বেশি সংগঠিত ও অভিজ্ঞ। ফলে মার্কিন বাহিনীর সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াই নিজস্ব সক্ষমতায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে ইরাকের সামনে নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে ইরাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। তবে এ পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে ইরাকি বাহিনীর কার্যকর সক্ষমতা, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ এবং ইসলামিক স্টেটের অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক মোকাবিলার ওপর। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সহযোগিতার ধরনও ইরাকের স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার দেশটির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে বিদেশি সামরিক উপস্থিতির অবসানের পর ইরাক কতটা স্বাধীনভাবে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাবের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তা-ই এখন দেশটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।