
নিজস্ব প্রতিবেদক
আজ ২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্যপ্রাপ্তির সর্বজনীন অধিকার দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—‘ডিজিটাল যুগে তথ্যের সততা রক্ষা’। নাগরিকের কাছে সরকারি তথ্য দ্রুত, সহজ ও নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছে দেওয়ার ওপর যখন বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, ঠিক এমন দিনেই চট্টগ্রামের সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইটে তথ্য হালনাগাদে অসংগতির চিত্র ধরা পড়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম ওয়াসা, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ওয়েবসাইট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মূল ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের বিভিন্ন নোটিশ, বিজ্ঞপ্তি ও সাম্প্রতিক তথ্য নিয়মিত প্রকাশিত হলেও তথ্য অধিকার, স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ এবং বার্ষিক প্রতিবেদনসংক্রান্ত নির্দিষ্ট পেজে এখনো কয়েক বছর আগের তথ্যই সর্বশেষ হিসেবে রয়ে গেছে। কোথাও ২০২১, কোথাও ২০২২-২৩ অর্থবছর, আবার কোথাও ২০২৩ সালের তথ্য সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে দৃশ্যমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশের উদ্দেশ্য শুধু তথ্য সংরক্ষণ নয়; নাগরিককে সঠিক সময়ে সর্বশেষ ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের নাগরিকবান্ধব প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও এর অন্যতম লক্ষ্য। একই ওয়েবসাইটের একটি অংশে ২০২৬ সালের তথ্য থাকলেও তথ্য অধিকারসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পেজে কয়েক বছর আগের তথ্য থাকলে নাগরিকের কাছে কোন তথ্যটি সর্বশেষ ও কার্যকর—তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের জন্য পৃথক বিভাগ রয়েছে। সেখানে তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা, আপিল কর্তৃপক্ষ, তথ্যের আবেদন ও আপিলের ফরম, স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকাশযোগ্য তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট আইন-বিধির লিংক রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে বন্দরের মূল ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের বিভিন্ন নোটিশ ও সাম্প্রতিক তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। তবে তথ্য অধিকার আইন, বিধি, নীতিমালা, পরিপত্র ও নির্দেশিকাসংক্রান্ত নির্দিষ্ট পেজটির সর্বশেষ হালনাগাদের তারিখ ২০২৫ সালের ২৯ মে।
অর্থাৎ মূল ওয়েবসাইটে নিয়মিত নতুন তথ্য যুক্ত হলেও তথ্য অধিকারসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কনটেন্টের বড় একটি অংশ দীর্ঘ সময় ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ওয়েবসাইটে তথ্য অধিকারসংক্রান্ত তথ্যের হালনাগাদে আরও বড় ব্যবধান দেখা গেছে। ‘তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’ শীর্ষক পেজটির সর্বশেষ হালনাগাদের তারিখ ২০২১ সালের ২৯ আগস্ট।
অথচ একই ওয়েবসাইটের মূল নোটিশ অংশে ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক তথ্য রয়েছে। পানি সরবরাহ বিঘ্নসংক্রান্ত জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন সাম্প্রতিক নোটিশ সেখানে প্রকাশিত হয়েছে।
ফলে ওয়েবসাইটের সামগ্রিক কার্যক্রমে নিয়মিত হালনাগাদের চিত্র থাকলেও তথ্য অধিকারসংক্রান্ত নির্দিষ্ট কনটেন্টে প্রায় পাঁচ বছরের পুরোনো তথ্য পড়ে থাকার বিষয়টি প্রশ্ন তৈরি করেছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) মূল ওয়েবসাইটেও ২০২৬ সালের নোটিশ ও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হচ্ছে। তবে তথ্য অধিকারসংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট তালিকায় সর্বশেষ দৃশ্যমান প্রতিবেদন ২০২২-২৩ অর্থবছরের।
ওয়েবসাইটে আগের কয়েক অর্থবছরের প্রতিবেদনও তালিকাভুক্ত রয়েছে। কিন্তু পরবর্তী অর্থবছরগুলোর প্রতিবেদন একইভাবে দৃশ্যমান না থাকায় নাগরিক ও গবেষকদের জন্য সিডিএর তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের সর্বশেষ চিত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ওয়েবসাইটে তথ্য অধিকারসংক্রান্ত পৃথক বিভাগ রয়েছে। সেখানে তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তার তথ্য, তথ্য ও আপিলের আবেদন ফরম, সংশ্লিষ্ট আইন-বিধি এবং স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকাশযোগ্য তথ্যের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
চসিকের মূল ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের বিভিন্ন নোটিশ ও সাম্প্রতিক তথ্য পাওয়া গেলেও তথ্য অধিকার বিভাগের সব কনটেন্ট একই সময়সীমায় হালনাগাদ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
তথ্য অধিকার আইনের মূল উদ্দেশ্য নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ নিশ্চিত করা। ডিজিটাল যুগে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইট সেই তথ্যপ্রাপ্তির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ফলে ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে শুধু তথ্য আপলোড করাই যথেষ্ট নয়; তথ্যটি সর্বশেষ, সঠিক, পূর্ণাঙ্গ ও সহজে শনাক্তযোগ্য হওয়াও জরুরি।
একই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে একদিকে ২০২৬ সালের তথ্য এবং অন্যদিকে ২০২১ বা ২০২২-২৩ সালের পুরোনো তথ্য থাকলে সাধারণ নাগরিকের পক্ষে সর্বশেষ তথ্যটি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে তথ্য অধিকার আবেদন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, আপিল কর্তৃপক্ষ, বার্ষিক প্রতিবেদন ও স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পুরোনো তথ্য থাকলে তা নাগরিক সেবা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যার কারণ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক তথ্যপ্রাপ্তির সর্বজনীন অধিকার দিবসে তাই চট্টগ্রামের সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইটে তথ্যের হালনাগাদ, নির্ভুলতা ও সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। নাগরিকদের প্রত্যাশা—ডিজিটাল সরকারি প্ল্যাটফর্মে তথ্য শুধু প্রকাশিতই হবে না, বরং তা হবে সর্বশেষ, নির্ভরযোগ্য, যাচাইযোগ্য ও সহজপ্রাপ্য।