
নিজস্ব প্রতিবেদন
ইরানের প্রস্তাবিত সাত দিনের যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার রূপরেখা প্রত্যাখ্যান করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই সিদ্ধান্তে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হবে কি না—তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। সর্বশেষ তথ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ০.৮০ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৮.২২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। দিনের শুরুতে দাম ১ শতাংশেরও বেশি বেড়েছিল। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সংঘাতের সম্ভাব্য প্রভাবই বাজারে সরবরাহ-উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
এর আগে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দাবিগুলো মেনে নিলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে পরমাণু আলোচনা শুরু করা সম্ভব। ইরানের প্রস্তাবটি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছানো হয়েছিল।
আরাগচির দেওয়া রূপরেখা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক চাপ কমানো, ইরানি বন্দরের ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলসহ কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে সংঘাত বন্ধের বিষয়টিও প্রস্তাবের অংশ ছিল। এসব শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক নৌ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরুর কথা বলা হয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আরাগচি বলেন, প্রস্তাবের শর্তগুলো বাস্তবায়ন করা হলে কয়েক দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের ওপরই পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করছে।
তবে ইরানের এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। শনিবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরান একটি প্রস্তাব দিয়েছিল এবং তিনি সেটি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পর হরমুজ প্রণালি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হতো। ফলে প্রণালিটির নৌ চলাচল দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কাতারসহ কয়েকটি দেশ দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে মধ্যস্থতা করছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার বিষয়ে অগ্রগতি না হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তেলের সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফলে এখন আন্তর্জাতিক বাজারের নজর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দ্রুত স্বাভাবিক হয়, নাকি সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হয়—তার ওপরই আগামী দিনে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পরিস্থিতির বড় একটি অংশ নির্ভর করছে।