নিউজ বাংলা ডেস্ক : সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো শরিয়াহভিত্তিক একটি স্কিম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়েছে এবং আইনের খসড়া প্রণয়ন করে জাতীয় সংসদে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের (এনপিএ) পরিচালনা পর্ষদ নতুন স্কিম চালুর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।
শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ, তহবিল পরিচালনা, মুনাফা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কাঠামো নির্ধারণে বর্তমানে কাজ চলছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান জানিয়েছেন, ইসলামিক বা শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তিনি জানান, প্রস্তাবিত স্কিমের কাঠামো, পরিচালনপদ্ধতি, বিনিয়োগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য কারিগরি বিষয় নির্ধারণ করা হচ্ছে। এ কাজে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকেরা যুক্ত রয়েছেন। পাশাপাশি স্কিমটির আর্থিক স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি দায় নির্ধারণে অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণও করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনি ও কারিগরি প্রস্তুতি শেষ করে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগনীতির আওতায় স্কিমটি চালু হলে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় আলাদা বিনিয়োগ ও পরিচালনা কাঠামো যুক্ত হবে। এতে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশন সুবিধা নিতে আগ্রহীদের জন্য নতুন অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ বৈঠকে শরিয়াহভিত্তিক সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালুর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে সর্বজনীন পেনশনের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা এবং অংশগ্রহণ বাড়ানো নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব আলোচনা করা হয়।
নতুন স্কিমে পেনশন তহবিল শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। তহবিলের অর্থ কোন খাতে এবং কীভাবে বিনিয়োগ হবে, পরিচালন ব্যয় ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি কী হবে—এসব বিষয় পর্যালোচনা করে কাঠামো চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান।
শরিয়াহভিত্তিক স্কিমের পাশাপাশি বিদ্যমান সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার বিভিন্ন সুবিধাও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে পেনশনার মারা গেলে তার স্বামী বা স্ত্রী কিংবা নির্ধারিত সুবিধাভোগীর পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়টি রয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো পেনশনারের মৃত্যু হলে তার স্বামী বা স্ত্রী ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পাবেন। আগে এই বয়সসীমা ছিল ৭৫ বছর। অন্যদিকে পেনশনার নিজে জীবিত থাকা পর্যন্ত আজীবন পেনশন সুবিধা পাবেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সর্বজনীন পেনশন তহবিলের বিনিয়োগ থেকে গ্রাহকদের মুনাফার হারও বাড়ানো হয়েছে। আগে নির্ধারিত ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে তা বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ করা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এ হারে মুনাফা দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়।
সর্বজনীন পেনশনের আওতা বাড়াতে সরকারি মালিকানাধীন যেসব প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির কর্মীরা প্রচলিত সরকারি পেনশন সুবিধার বাইরে রয়েছেন, তাদের ‘প্রগতি’ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠানগুলোকে এতে যুক্ত করা হবে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সেটি পরে নির্ধারণ করা হবে।
বিদেশগামী কর্মীদেরও পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশে যাওয়ার আগে তাদের ‘প্রবাস’ স্কিম সম্পর্কে জানানো এবং নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বিদেশ যাওয়ার আগেই কর্মীদের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় যুক্ত করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে সর্বজনীন পেনশনে পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর। এই বয়সসীমা কমিয়ে ৫৫ বছর করার প্রস্তাব নিয়ে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণের পর এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
পেনশন তহবিল থেকে অংশগ্রহণকারীদের ঋণ দেওয়ার বিষয়টিও বৈঠকে আলোচিত হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। তহবিল বিনিয়োগের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন নিশ্চিত করা এবং ঋণ দেওয়ার কারণে পেনশনভোগীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়ার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
পেনশন কর্মসূচির সঙ্গে স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। কোন মডেলে এটি চালু করা যায় এবং এর ফলে পেনশন তহবিলের ওপর কী ধরনের আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশনের মুনাফা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
নতুন গ্রাহক বাড়াতে নিবন্ধন কার্যক্রমে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রণোদনা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসসহ বিভিন্ন মাধ্যমে গ্রাহক নিবন্ধন করা হচ্ছে। আগে একজন নতুন গ্রাহক নিবন্ধনে ১৫ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হলেও এখন তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারি নিরীক্ষার পাশাপাশি একটি বেসরকারি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম দিয়ে আর্থিক কার্যক্রম অডিট করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে তহবিলের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে অতিরিক্ত নিরীক্ষা কাঠামো যুক্ত হবে।
দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার আওতায় দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আনার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হয়। বর্তমানে এতে প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাস—এই চারটি স্কিম চালু রয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শুরু পর্যন্ত চারটি স্কিমে মোট নিবন্ধিত গ্রাহক প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার। তাদের জমা করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ‘সমতা’ স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন এবং তাদের জমার পরিমাণ ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে প্রবাসীদের জন্য চালু ‘প্রবাস’ স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ১ হাজার ১৭১ জন। এ স্কিমে মোট জমা হয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় প্রত্যাশিত মাত্রায় অংশগ্রহণ না বাড়ায় নতুন এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালু, পেনশনারের মৃত্যুর পর স্বামী বা স্ত্রীর পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা বাড়ানো, বিনিয়োগের মুনাফা নির্ধারণ, সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অন্তর্ভুক্তি এবং নিবন্ধনে প্রণোদনা বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসূচিটির পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
শরিয়াহভিত্তিক স্কিম অনুমোদনের মাধ্যমে বিদ্যমান চারটি স্কিমের পাশাপাশি নতুন একটি কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এটি চালুর আগে আইনি কাঠামো প্রণয়ন, সংসদীয় প্রক্রিয়া, বিনিয়োগনীতি নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় অ্যাকচুয়ারিয়াল ও কারিগরি বিশ্লেষণ সম্পন্ন করতে হবে। এসব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই স্কিমটি চালুর পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারিত হবে।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় নতুন একটি স্কিম যুক্ত করার পাশাপাশি বিনিয়োগ কাঠামো, অংশগ্রহণের পরিধি ও সুবিধার ধরন বিস্তৃত করার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। শরিয়াহভিত্তিক স্কিমের বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে আইনগত কাঠামো চূড়ান্ত করে জাতীয় সংসদে পাঠানো এবং পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ওপর।