
নিজস্ব প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডাকযোগে ভোট বা মেইল-ইন ব্যালট দেওয়ার সুযোগ সীমিত করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া উদ্যোগে বড় ধরনের আইনি বাধা তৈরি হয়েছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নির্বাচনী ডাকব্যবস্থা কার্যকরের ওপর নিম্ন আদালতের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছেন। ফলে মার্কিন পোস্টাল সার্ভিস (ইউএসপিএস) আপাতত পোস্টাল ব্যালট নিয়ে প্রশাসনের প্রস্তাবিত নতুন নিয়ম বাস্তবায়ন করতে পারছে না।
আদালতের এ সিদ্ধান্তকে হোয়াইট হাউসের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে মামলাটির আইনি লড়াই এখানেই শেষ হচ্ছে না। রক্ষণশীল বিচারক ব্রেট কাভানাভ সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হলেও তার পৃথক মতামতে ইঙ্গিত দিয়েছেন, মামলার পরবর্তী ধাপে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের পক্ষে রায় দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্বাচনী জালিয়াতি ঠেকানোর যুক্তিতে চলতি বছরের মার্চে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এতে ইউএসপিএসকে নির্দিষ্ট নাগরিক তালিকায় থাকা ভোটারদের কাছে ব্যালট পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে নতুন ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি পোস্টাল ব্যালটের খামে ইউনিক বারকোড ব্যবহারের নির্দেশ এবং মেইল ব্যালট পাওয়া ভোটারদের তথ্য অনলাইন পোর্টালে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করতে বলা হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এসব ব্যবস্থা নির্বাচনী জালিয়াতি রোধ ও ভোটব্যবস্থার নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়ক হবে। তবে এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে ২৩টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসি মামলা করে। তাদের অভিযোগ, ফেডারেল সরকারের এ ধরনের হস্তক্ষেপ রাজ্যগুলোর নিজস্ব নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক ক্ষমতা খর্ব করছে।
মামলায় আরও বলা হয়, মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে পোস্টাল ভোটের নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে এবং অনেক ভোটার কার্যত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
বোস্টনভিত্তিক ফেডারেল বিচারক ইন্দিরা তালওয়ানি গত ৪ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তিনি বলেন, নভেম্বরের নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে নতুন নিয়ম কার্যকর করা হলে ভোটারদের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরে একটি মার্কিন আপিল আদালতও ওই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করতে অস্বীকৃতি জানায়।
সুপ্রিম কোর্টে বিচারক কাভানাভ বলেন, প্রস্তাবিত চূড়ান্ত নিয়মটি পোস্টাল সার্ভিসের আইনগত এখতিয়ারের মধ্যে পড়ার ‘ভালো সম্ভাবনা’ রয়েছে। তবে তার মতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে এত দেরিতে ওই নিয়ম কার্যকর করা নির্বিচার ও অযৌক্তিক হবে।
অন্যদিকে রক্ষণশীল বিচারক স্যামুয়েল অ্যালিতো ও ক্লেরেন্স থমাস সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তারা যুক্তি দেন, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে করা আইনি চ্যালেঞ্জটি ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তাদের ভাষায়, এটি ছিল একটি ‘হেইল মেরি পাস’—অর্থাৎ শেষ মুহূর্তের ক্ষীণ আশার চেষ্টা। তাদের মতে, ডাকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ ও চিঠিপত্র আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে পোস্টাল সার্ভিসের নিজস্ব এখতিয়ার রয়েছে।
এদিকে পোস্টাল শ্রমিক ইউনিয়নগুলো জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে নতুন নিয়ম কার্যকর করার জন্য কর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো সময়ও প্রশাসনের হাতে ছিল না।
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এরই মধ্যে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে মেইল-ইন ব্যালট বিতরণ শুরু হয়েছে। নভেম্বরের এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা অনেকাংশে নির্ধারিত হবে।
মেইল-ইন ব্যালট নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের এটাই প্রথম সংঘাত নয়। এর আগে জুনে আদালত রায় দিয়েছিলেন, অঙ্গরাজ্যগুলো নির্বাচনের দিন পর্যন্ত ডাকযোগে পৌঁছানো ব্যালট গণনা করতে পারবে। এর ফলে নির্বাচনের দিন শেষ হওয়ার পর ব্যালট পৌঁছালে তা গণনা না করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হয়।
হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয়বার ফিরে আসার পর থেকেই ডাকযোগে ভোটের সুযোগ সীমিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন ট্রাম্প। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মেইল-ইন ভোটে অনাগরিকদের ভোট দেওয়ার সুযোগ এবং ব্যাপক নির্বাচনী জালিয়াতির আশঙ্কার কথা বলে আসছেন। তবে এসব দাবির পক্ষে ব্যাপক জালিয়াতির কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে আপাতত ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ডাকভোট বিধি বাস্তবায়ন আটকে গেলেও, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় নির্বাচনের আগে বিষয়টি আবারও আদালতের সামনে আসতে পারে।