
নিজস্ব প্রতিবেদক
শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে এক-দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চলমান সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। এটি ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার সংকট চিহ্নিত করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে এবং এখন তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।
সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টার মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট, শিল্পে গ্যাস সরবরাহ, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ এবং সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপুল পরে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
সভায় ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনা দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে দুর্ঘটনার কারণে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্প-কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে। তবে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যার সমাধান ইতোমধ্যে করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইনশা আল্লাহ, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক-দেড় মাস আগে যে অবস্থায় ছিল, সে রকম একটা অবস্থায় ফিরে আসবে।’
গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে গত এক মাসে নতুন টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তুতি মোটামুটি সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুত এর কাজ শুরু হবে এবং ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনালকে সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটকে ‘উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেছে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, কোনো কিছু পরিকল্পনা করা এবং তা বাস্তবায়নে সময় লাগে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মতো বড় খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা চাইলেই ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাব্য সময়সীমাও তুলে ধরা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে সরকারের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা রয়েছে।
দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ সময়মতো ঠিক করবে কাকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেবে। তবে যে সময় যে সরকার দায়িত্বে থাকে, তাকে তার পরিকল্পিত কাজগুলো সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া উচিত।
সরকারের পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলে তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার জন্য ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব শুধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো দেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।
চলমান সংকট নিয়ে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমস্যার ব্যাপ্তি ও জটিলতা সম্পর্কে ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই অবগত। সরকার সমস্যাগুলো আড়াল না করে খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছে এবং কীভাবে সেগুলোর সমাধান করতে চায়, সেটিও জানিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এতটুকু আমরা আপনাদের জানাতে চেয়েছি যে আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। সে জন্য হতাশ হওয়ার মতো কারণ নেই।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বড় কোনো কাজ সফলভাবে করতে হলে একটি কার্যকর দল প্রয়োজন। সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাই একসঙ্গে কাজ করছেন, যাতে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।
ব্যবসায়ী নেতাদের পাশাপাশি গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোর কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা গণমাধ্যমের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তা না হলে বিচ্ছিন্ন তথ্য থেকে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
গণমাধ্যম সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেলে তা দেশবাসীর কাছেও সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সহযোগিতা করবেন, যাতে আমরা আপনাদের জন্য আরও ভালো কিছু করতে পারি।’
সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও মাহদী আমিন, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এবং জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হক উপস্থিত ছিলেন।
ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কামাল, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক, বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব আনামসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, ইংরেজি দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার, মোস্তাফা ফিরোজ, আব্দুন নূর তুষার, আকবর হোসেন, শাহেদ আলম, রেজাউল করিম রনি, আজিজুর রহমান রিপন, তরিকুল ইসলাম সৌরভ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহরিন ইসলাম খান সভায় উপস্থিত ছিলেন।