
নিজস্ব প্রতিবেদক
গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রণীত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর গেজেট আকারে প্রকাশিত ২০২৬ সালের ১০৭ নম্বর এই আইনে গুমের জন্য শাস্তি, ভুক্তভোগী ও পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ এবং গুরুতর ক্ষেত্রে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে এর তদন্ত কাঠামো নিয়ে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত কতটা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হবে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ পালন করার দাবি দায় নির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলবে—তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
আইনের ঘোষিত উদ্দেশ্য গুম প্রতিরোধ, দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগী ও পরিবারের অধিকার রক্ষা। একই সঙ্গে মানবাধিকার, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে আইনে গড়ে তোলা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন মূল আলোচনার বিষয়।
আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক কোনো ব্যক্তিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে হাজির না করে গোপন স্থানে রাখার ঘটনাকে গুম হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার পর কাউকে আইনি সহায়তা ছাড়া গোপনে আটকে রাখা হলে তা গুমের আওতায় পড়তে পারে।
তবে বাস্তবে এই বিধান প্রয়োগে জটিলতা দেখা দিতে পারে। কোনো ব্যক্তিকে আটকের বিষয়টি যদি সরকারি নথিতে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ না করা হয়, তাহলে ২৪ ঘণ্টার সময় গণনা শুরু হবে কখন থেকে—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
পরিবার যদি জানতে না পারে তাদের স্বজনকে কখন, কোথা থেকে এবং কারা আটক করেছে, তাহলে তদন্তকারী সংস্থা বা আদালত কীভাবে আটকের সময় ও স্থান নির্ধারণ করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। গুমের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় হেফাজত গোপন রাখাই যখন অপরাধের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, তখন আটক-সংক্রান্ত স্বাধীন, বাধ্যতামূলক ও যাচাইযোগ্য নিবন্ধনব্যবস্থা থাকা জরুরি।
আইনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে তদন্তের কাঠামোকে। আগের খসড়া ও সংশ্লিষ্ট আলোচনায় মানবাধিকার কমিশনের নজরদারি, আটকস্থল পরিদর্শন এবং গোপন আটককেন্দ্র শনাক্তের মতো ক্ষমতার বিষয় উঠে এসেছিল। তবে চূড়ান্ত আইনে এসব ক্ষমতা কতটা কার্যকরভাবে রাখা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
গুমের অভিযোগ সাধারণত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে ওঠে। ফলে একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রচলিত তদন্তব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। অভিযোগের তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবমুক্ত না করা গেলে আইনটির বিচারিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গুম সাধারণত একক কোনো ব্যক্তির সিদ্ধান্তে সংঘটিত হয় না। এতে নির্দেশ দেওয়া, পরিকল্পনা করা, আটক, স্থানান্তর, পাহারা, তথ্য গোপন এবং প্রমাণ নষ্ট করার মতো একাধিক স্তরের ভূমিকা থাকতে পারে। তাই অপরাধে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেওয়া ব্যক্তির পাশাপাশি নির্দেশদাতা ও দায়ী কমান্ড কাঠামোর সদস্যদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
আগের খসড়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় থেকে মুক্তির কারণ হতে পারবে না—এমন সুরক্ষা ছিল বলে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছিল। পরবর্তী খসড়ায় এ ধরনের বিধান বাদ পড়েছে কি না, তা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
আইনে যদি ‘ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ পালন’ বিষয়ে স্পষ্ট বিধান না থাকে, তাহলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা দায় এড়ানোর জন্য প্রশাসনিক কমান্ড কাঠামোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। একই সঙ্গে বেআইনি নির্দেশ দেওয়া ব্যক্তি এবং তা জেনেও বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তার দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে, সে বিষয়েও পরিষ্কার নির্দেশনা প্রয়োজন।
আইনে গুমের ঘটনায় মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণ গুমের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। তদন্ত ও বিচার দ্রুত শেষ করার সময়সীমার কথাও বলা হয়েছে।
তবে শাস্তির মাত্রা কঠোর হলেই বিচার নিশ্চিত হয় না। তদন্ত স্বাধীন না হলে, প্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা থাকলে এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে কঠোর শাস্তির বিধান বাস্তবে কার্যকর নাও হতে পারে।
গুমের বিচার সফল করতে হলে অভিযোগ দ্রুত নথিভুক্ত করা, আটক ও হেফাজতের তথ্য সংরক্ষণ, সম্ভাব্য আটককেন্দ্র শনাক্ত, ডিজিটাল ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ সুরক্ষিত করা এবং কমান্ড কাঠামোর ভূমিকা তদন্ত করা জরুরি।
আইনে ভুক্তভোগী ও পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের সুযোগ রাখা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের অর্থ বহনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
এটি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও গুমের পরিবারের প্রতিকার শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণে সীমাবদ্ধ নয়। তারা জানতে চান—স্বজনকে কারা নিয়ে গেছে, কোথায় রাখা হয়েছিল, কেন আটক করা হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তার কী পরিণতি হয়েছে।
তাই নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান ও পরিণতি সম্পর্কে সত্য প্রকাশ, গোপন আটকস্থল শনাক্ত, রাষ্ট্রীয় নথি উন্মুক্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা পরিবারের ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ক্ষতিপূরণ কোনোভাবেই সত্য উদঘাটন বা বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।
‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ দেশের মানবাধিকার সুরক্ষা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে আইন প্রণয়নই গুমের সংস্কৃতি বন্ধের শেষ ধাপ নয়; বরং এর কার্যকর প্রয়োগই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আইনটি সফল করতে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবমুক্ত করা, আটক-নিবন্ধন বাধ্যতামূলক ও যাচাইযোগ্য করা, গোপন আটককেন্দ্র শনাক্তের ক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং ঊর্ধ্বতনের বেআইনি নির্দেশের আড়ালে দায় এড়ানোর সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
আইনের সাফল্য শুধু মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনের বিধানে নির্ভর করবে না। কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি, কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও তদন্ত ও বিচার সমানভাবে এগিয়ে নেওয়া যায় কি না—সেটিই হবে এই আইনের বিশ্বাসযোগ্যতার চূড়ান্ত পরীক্ষা।