
নিজস্ব প্রতিবেদন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদ্য সমাপ্ত তৃতীয় অধিবেশন রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা কারণে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মাত্র ৯ কার্যদিবসের এই সংক্ষিপ্ত অধিবেশনে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস, সংসদীয় কমিটি গঠন-পুনর্গঠন, প্রশ্নোত্তর ও বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে আলোচনা যেমন হয়েছে, তেমনি সরকার ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যে উঠে এসেছে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, সুশাসন, দুর্নীতি দমন, জাতীয় ঐক্য ও সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন দিকনির্দেশনা।
তবে স্বল্প সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কয়েকটি আইন পাসের কারণে সংসদে এসব আইনের ধারা-উপধারা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা ও যাচাই-বাছাই হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে একদিকে অধিবেশনকে তুলনামূলকভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন অনেকে, অন্যদিকে সংসদকে সত্যিকার অর্থে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে আরও কার্যকর ও দীর্ঘ অধিবেশনের দাবি উঠেছে।
গত ২৭ আগস্ট শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন। মোট ৯ কার্যদিবসের এই অধিবেশনে ছয়টি বিল উত্থাপিত এবং ছয়টি বিল পাস হয়। একই সঙ্গে তিনটি বিশেষ কমিটিসহ ৪৮টির বেশি সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়েছে। সংসদীয় কার্যপ্রণালীর বিভিন্ন বিধির আওতায় সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নোটিশ দেন।
সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৬৮ বিধিতে সাতটি নোটিশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটি নোটিশ গৃহীত ও আলোচিত হয়েছে। ৭১ বিধিতে ১৫টি নোটিশ গৃহীত হয় এবং ১৪টির ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৭১(ক) বিধিতে দুই মিনিটের বক্তব্যের জন্য পাওয়া যায় ১২৪টি নোটিশ। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ১৪৪টি প্রশ্নের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিজে ১৫টির উত্তর দিয়েছেন। মন্ত্রিসভার সদস্যরা মোট ২ হাজার ৬৭৬টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৬৭৮টির উত্তর দিয়েছেন।
অধিবেশনের শেষ দিনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় রাজনৈতিক শিষ্টাচার, জাতীয় ঐক্য ও সংসদকে কার্যকর করার বিষয়টি। তিনি রাজনীতিতে গালিগালাজ, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অবমাননাকর ভাষার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শিষ্টাচার বজায় রাখা জরুরি। দেশের উন্নয়ন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তি বা দলের চেয়ে দেশ বড়। রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘বাংলাদেশ প্রথম’।
সংসদকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। জনগণের অধিকার ও সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সংসদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন তিনি।
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে ছিল সরকারের প্রতি সতর্কবার্তা এবং গঠনমূলক বিরোধিতার ঘোষণা। দুর্নীতিকে উন্নয়ন ও সুশাসনের প্রধান অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের দাবি জানান।
চাকরিতে দলীয় আনুকূল্য ও অন্যায্য সুবিধা বন্ধ করে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার তাগিদ দেন বিরোধীদলীয় নেতা। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গতানুগতিক অন্ধ বিরোধিতার পরিবর্তে সরকারের ভালো কাজের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের ভুল হলে গঠনমূলক সমালোচনা করা হবে; আর জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে প্রয়োজনে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংসদ নেতার শিষ্টাচার ও জাতীয় ঐক্যের আহ্বান এবং বিরোধীদলীয় নেতার গঠনমূলক বিরোধিতার ঘোষণা—দুটি বক্তব্যই দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন ধরনের সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তৃতীয় অধিবেশনে পাস হওয়া আইনগুলোর মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬ এবং জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬ বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। বিগত সময়ে সংঘটিত গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে দেশের আইন সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ক্ষেত্রে এ দুটি আইনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আধুনিকায়নের লক্ষ্যে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬ পাস হয়েছে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তদন্ত ক্ষমতা সম্প্রসারণ-সংক্রান্ত আইনও এ অধিবেশনে পাস হয়।
তবে এসব আইনের কয়েকটি নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে তীব্র বিতর্ক হয়েছে।
বিশেষ করে ট্রান্সফার অব প্রপার্টিজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। গত ৬ সেপ্টেম্বর বিলটি পাসের সময় জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের মিত্ররা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন। বিরোধী দলের অভিযোগ, বিলটি ইসলামী সম্পত্তি হস্তান্তর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং কুরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী। তারা ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার দাবি জানান।
অন্যদিকে র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন নতুন বাহিনী হিসেবে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন গঠনের বিল নিয়েও বিরোধী দলের আপত্তি ছিল। বিলটি সংসদীয় কমিটিতে পাঠানোর পর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সাতটি আপত্তি জানানো হয়। নোট অব ডিসেন্টে জাতীয় পর্যায়ে পরামর্শ এবং শক্তিশালী জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, এসআরবি কোনোভাবেই র্যাবকে নতুন নামে ফিরিয়ে আনা নয়; র্যাব বিলুপ্ত করেই নতুন কাঠামোর বাহিনী গঠন করা হচ্ছে।
অধিবেশনে কৃষকদের সারসংকট নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান ভিন্ন ছিল। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সারের জন্য কৃষকদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। তাদের অভিযোগ, সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় সংকট রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, চাহিদার তুলনায় দেশে অতিরিক্ত সার মজুদ রয়েছে। নতুন পরিবেশক নিয়োগসহ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তৃতীয় অধিবেশনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—মাত্র ৯ কার্যদিবসে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের ক্ষেত্রে সংসদ কতটা গভীরভাবে আইনগুলো পর্যালোচনা করতে পেরেছে।
সমালোচকদের মতে, আইন পাসের আগে সংসদীয় কমিটি ও মূল অধিবেশনে প্রতিটি ধারার ওপর পর্যাপ্ত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। অতীতে দ্রুত আইন পাসের যে সংস্কৃতি ছিল, তা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে হলে সংসদীয় কমিটিগুলোকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে।
তাদের মতে, মন্ত্রীদের ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সংসদীয় জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিক। তবে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ১৪৪টি প্রশ্নের মধ্যে মাত্র ১৫টির উত্তর দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারপ্রধানের কাছ থেকে জনগণের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর আরও বেশি উত্তর প্রত্যাশিত।
বিশিষ্টজনদের মতে, দেশের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি ও জনদুর্ভোগের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আরও দীর্ঘ ও গভীর আলোচনা প্রয়োজন ছিল। সংসদকে কেবল আইন পাসের আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্র না বানিয়ে প্রকৃত নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে ভবিষ্যৎ অধিবেশনের মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে হবে।
তবে ইতিবাচক দিকও দেখছেন অনেকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত দুই সংসদের তুলনায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বর্তমান অধিবেশনের পরিবেশ ছিল তুলনামূলকভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ। বিরোধী দলের বক্তব্য ও আপত্তি শোনার ক্ষেত্রে আগের মতো একতরফা মনোভাব দেখা যায়নি বলেও মনে করছেন তারা।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) অধিবেশন শেষে সংসদ সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মতভিন্নতাকে গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। ভবিষ্যৎ অধিবেশনেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং সংসদীয় রীতিনীতি ও কার্যপ্রণালি বিধি মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় ইচ্ছা করলে এককভাবে আইন পাস করতে পারে। কিন্তু সরকার তা না করে বিরোধী দলসহ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে চায়।
তার ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী কোনো একটি দলের প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় সরকার সবার সহযোগিতা চায়।
সব মিলিয়ে তৃতীয় অধিবেশন শেষ হয়েছে একদিকে রাজনৈতিক শিষ্টাচার, জাতীয় ঐক্য ও গঠনমূলক বিরোধিতার নতুন বার্তা দিয়ে; অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ আইন দ্রুত পাস, সংসদীয় বিতর্কের গভীরতা এবং জবাবদিহিতার পরিধি নিয়ে রেখে গেছে বেশ কিছু প্রশ্ন।
এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—অধিবেশনের সমাপনী দিনে দেওয়া দুই শীর্ষ নেতার বক্তব্য বাস্তব রাজনীতিতে কতটা প্রতিফলিত হয়। সংসদ কি সত্যিই জনগণের সমস্যা ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র হয়ে উঠবে, নাকি আইন পাসের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই এর কার্যকারিতা সীমিত থাকবে—আগামী অধিবেশনগুলোই তার উত্তর দেবে।