
নিজস্ব প্রতিবেদক
ইরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে মিসরের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কার মধ্যেই এক দশক পর কায়রো সফরে গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দুই দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে আজ বুধবার মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় কায়রো পৌঁছান শি জিনপিং। তার সঙ্গে রয়েছেন ফার্স্ট লেডি পেং লিয়ুয়ান। বিমানবন্দরে চীনা প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে স্বাগত জানান মিসরের প্রেসিডেন্ট সিসি ও ফার্স্ট লেডি এন্তেসার আমের। এ সময় লোকনৃত্য পরিবেশনকারী একটি দল তাদের অভ্যর্থনা জানায়। বিমানবন্দরের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরদের অনেকের পরনে ছিল শি জিনপিংয়ের ছবি সংবলিত টি-শার্ট।
সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি সই হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের সফরকে কাজে লাগিয়ে কায়রো তার কৌশলগত স্বাধীনতার অবস্থান তুলে ধরতে চাইছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিং—দুই পরাশক্তির সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা দেখাতে চাইছে মিসর।
মঙ্গলবার দেশটির সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে প্রেসিডেন্ট সিসি মিসরের ‘স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি’র ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এর কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র মিসরের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক ব্যাংক মিসর-এর সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি শাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
গত মাসে ওয়াশিংটন ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়ে আরও ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেয়। সম্ভাব্য এসব নিষেধাজ্ঞার আওতায় চীনা ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ইরানের অন্যতম বড় তেল ক্রেতা চীন অবশ্য জানিয়েছে, তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবে।
এদিকে চলতি মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠকের কথা রয়েছে। তার আগে চীন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। মিসর এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার অন্যতম বড় গ্রহীতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও পরিচিত।
সিসির ১২ বছরের শাসনামলে মিসরের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কায়রো থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পূর্বে নির্মিত নতুন প্রশাসনিক রাজধানীর ফাইন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস ডিস্ট্রিক্টে আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণেও চীনা অর্থায়ন রয়েছে।
এ ছাড়া সুয়েজ খাল অর্থনৈতিক অঞ্চল চীনের অন্যতম বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্র। বৈশ্বিক সমুদ্রবাণিজ্য যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে ঝুঁকির মুখে, তখন এ অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর বিষয়েও দুই নেতা আলোচনা করতে পারেন।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে আজকের বৈঠকে একাধিক চুক্তি হতে পারে। সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), পরিবহন ও জ্বালানি খাত রয়েছে।
মিসর ও চীন উভয়ই ব্রিকসের সদস্য। সিসি তার সাম্প্রতিক নিবন্ধে বলেছেন, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মেরুকরণের মধ্যে মিসর ও চীন ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর ভূমিকা শক্তিশালী করতে অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
সিসির শাসনামলে চীন-মিসর সামরিক সহযোগিতাও বেড়েছে। গত আগস্টে মিসর চীনা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বড় ধরনের যৌথ বিমান মহড়া আয়োজন করে। এতে চীনের জে-১৬ যুদ্ধবিমান অংশ নেয়।
শি জিনপিংয়ের সফর উপলক্ষে কায়রোর প্রধান সড়কগুলো চীন ও মিসরের পতাকা এবং দুই নেতার ছবি সংবলিত বিলবোর্ডে সাজানো হয়েছে। বিভিন্ন সড়কের সাইনবোর্ডে লেখা হয়েছে—‘মিসর-চীন বন্ধুত্ব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নীল নদের মতো প্রবহমান।’
সফরকে কেন্দ্র করে কায়রোতে ব্যাপক যানজটের আশঙ্কায় নগরবাসীকে দীর্ঘ সময়ের যাতায়াত বিলম্বের জন্য প্রস্তুত থাকতে সতর্ক করা হয়েছে। সফরের অংশ হিসেবে শি জিনপিংয়ের গিজার পিরামিডের কাছে অবস্থিত গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম পরিদর্শনেরও কথা রয়েছে।
চীনের শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে মিসরের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্তের পরিমাণ প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য চাপের মধ্যেও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার পথেই এগোচ্ছে কায়রো।