নিউজ বাংলা ডেস্ক : সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণে অবহেলার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় ভবনটির মালিক সোহেল রানাসহ আট আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা আবারও পিছিয়েছে। রায় দেওয়ার পরিবর্তে মামলাটি অধিকতর যুক্তিতর্কের জন্য আগামী ৬ অক্টোবর ধার্য করেছেন আদালত।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ বি.এম. তারিকুল কবীরের আদালতে মামলাটির রায় ঘোষণার দিন নির্ধারিত ছিল। তবে বিচারক স্বপ্রণোদিতভাবে মামলাটি রায় ঘোষণার তালিকা থেকে তুলে নিয়ে আরও যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী আরিফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বিচারক নিজ উদ্যোগেই মামলাটি রায় ঘোষণার তালিকা থেকে উত্তোলন করে অধিকতর যুক্তিতর্কের শুনানির জন্য ৬ অক্টোবর দিন ঠিক করেছেন। এ বিষয়ে কোনো পক্ষের আবেদন ছিল না বলেও জানান তিনি।
মামলার আট আসামির মধ্যে সোহেল রানা ছাড়াও রয়েছেন সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাবেক উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, সাবেক টাউন প্ল্যানার ফারজানা ইসলাম এবং লাইসেন্স পরিদর্শক মো. আব্দুল মোত্তালিব।
আসামিদের মধ্যে সোহেল রানা এই মামলায় জামিনে থাকলেও হত্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন। মঙ্গলবার তাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। মাহবুবুর রহমান ও ফারজানা ইসলাম মামলার শুরু থেকেই পলাতক। অন্য আসামিরা জামিনে রয়েছেন এবং এদিন আদালতে উপস্থিত হয়ে হাজিরা দেন।
মামলার বিচার চলাকালে সোহেল রানার বাবা আবদুল খালেক ও মা মর্জিনা খাতুন বেগম মারা যান। পরে তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৬ জন নিহত হন এবং দেড় হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। এ ঘটনার পর ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি অনুসন্ধানে নামে দুদক।
এরপর ২০১৪ সালের ১৫ জুন নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণের অভিযোগে সাভার থানায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক এস এম মফিদুল ইসলাম। রানা প্লাজা সোহেল রানার বাবার নামে থাকায় ওই সময় সোহেল রানাকে বাদ রেখে তার বাবা-মাসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়। তবে তদন্তে ভবনটির মূল দেখভালের দায়িত্ব সোহেল রানার ছিল বলে প্রমাণ পাওয়ার পর তাকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘রানা প্লাজা’ নামে সাততলা একটি শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ২০০৬ সালের ১০ এপ্রিল সাভার পৌরসভা নকশা অনুমোদন করে। পরে ২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি ছয়তলা ভবনটির ওপর আরও চারতলা নির্মাণের অনুমোদন চাওয়া হয়। এ ছাড়া শুরুতে ভবনটিতে শপিং কমপ্লেক্স করার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেখানে পাঁচটি গার্মেন্ট কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেয় সাভার পৌরসভা।
২০১৭ সালের ২১ মে ১০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচার শুরু হয়। তখন আটজনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন আদালত। বিচার চলাকালে মামলার ২০ সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় উদ্ধার অভিযানে ১ হাজার ১১৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৯ জনের মৃত্যু হয়। ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় ২ হাজার ৪৩৮ জনকে। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে ৮৪৪টি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা রেখে শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়া ২৯১টি মরদেহ জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।
জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১ হাজার ৫২৪ জন আহত হন। তাদের মধ্যে ৭৮ জন গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন। রানা প্লাজা ধসের পর ভারত পালিয়ে যাওয়ার সময় একই বছরের ২৯ এপ্রিল বেনাপোল থেকে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন সোহেল রানা। এরপর থেকে তিনি কারাগারে আটক রয়েছেন।