নিউজ বাংলা ডেস্ক : ভারতের বাজারে জাপানি ব্যবসা ও বিনিয়োগ দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বড় করপোরেশনের পাশাপাশি জাপানের ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানও এখন দেশটিতে কার্যক্রম বাড়াচ্ছে। ব্যাংকিং, খুচরা বিক্রি, অটোমোবাইল, প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই গত সপ্তাহে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল জাপান সফর করেন। এ সময় তিনি ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ভারতকে জাপানি ব্যবসায়ীরা ক্রমেই সম্ভাবনাময় বড় বাজার হিসেবে বিবেচনা করছেন।
জাপানের অভ্যন্তরীণ বাজার সংকুচিত হওয়ার বিষয়টিও বিদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে দেশটির কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করছে। ভারতের মুম্বাই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর বড় বিপণিবিতান এবং প্রধান সড়কগুলোতে এখন জাপানি ব্র্যান্ডের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লো ও মুজি এবং ক্রীড়া জুতার ব্র্যান্ড ওনিতসুকা টাইগার ইতোমধ্যে ভারতে ব্যবসা করছে এবং তাদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করছে।
শুধু বড় ব্র্যান্ডই নয়, বিশেষায়িত ও ছোট জাপানি কোম্পানিগুলোও ভারতের বাজারে প্রবেশ করছে। জাপানের আসবাবপত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নিতোরি সম্প্রতি ভারতে ব্যবসা শুরু করেছে। জনপ্রিয় সুবিধাজনক পণ্যের দোকান চেইন লসনও দেশটিতে কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে ১০ হাজার দোকান খোলা হবে এবং মুম্বাই থেকে এ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ভারতের প্রতি জাপানের আগ্রহ খুচরা ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশটির বড় ব্যাংকগুলোও ভারতের আর্থিক খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। যখন কিছু বিদেশি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ভারতের ব্যাংকিং খাত থেকে বিনিয়োগ কমাচ্ছে, তখন জাপানের বড় ব্যাংকগুলো ভারতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
গত বছর জাপানের সবচেয়ে বড় ব্যাংক এমইউএফজি ব্যাংক ভারতের ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান শ্রীরাম ফাইন্যান্সের ২০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তি ভারতের আর্থিক খাতে কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ছিল। একই বছরে জাপানের সুমিতোমো মিৎসুই ব্যাংকিং করপোরেশন ইয়েস ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শেয়ারধারীতে পরিণত হয়। বর্তমানে ব্যাংকটির হাতে ইয়েস ব্যাংকের ২৪ দশমিক ২২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
গবেষণা, প্রযুক্তি ও ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও ভারতকে বেছে নিচ্ছে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো। ডেলয়েটের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে ১০০টির বেশি জাপানি প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্র পরিচালনা করছে। এসব কেন্দ্র থেকে সাধারণত গবেষণা ও উন্নয়ন, ব্যবসায়িক কৌশল, প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালিত হয়। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের দ্রুত সম্প্রসারিত বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্র খাতে জাপানি কোম্পানিগুলোর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।
জাপানের কোম্পানিগুলোর ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ার অন্যতম কারণ দেশটির নিজস্ব বাজারের সীমাবদ্ধতা। সুজুকি মোটর করপোরেশনের সহায়তায় পরিচালিত বিনিয়োগ তহবিল নেক্সট ভারত ভেঞ্চার্সের প্রতিষ্ঠাতা বিপুল নাথ জিন্দাল বিবিসিকে বলেন, প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ খুঁজতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ভারতের দিকে তাকাচ্ছে। তার মতে, গত ১৬ থেকে ১৭ বছর ধরে জাপানের জনসংখ্যা কমছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদার পাশাপাশি বাজারের আকারও সংকুচিত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা বাড়াতে তাই জাপানি কোম্পানিগুলোকে বিদেশি বাজারের ওপর আরও নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।
সম্প্রতি সুজুকি মোটর করপোরেশন ভারতে ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চীন গুরুত্বপূর্ণ বাজার হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে ব্যবসার পরিবেশ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। জিন্দালের মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে চীনে জাপানের বিনিয়োগ কমেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও এখন ব্যবসার চাপ বেড়েছে। শুল্ক এবং স্থানীয় প্রতিযোগিতা সেখানে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জাপানি কোম্পানির উপস্থিতি থাকলেও সেসব বাজার ভারতের তুলনায় ছোট। বড় জনসংখ্যা ও দ্রুত সম্প্রসারিত অর্থনীতির কারণে ভারত তাই জাপানি ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
ভারত ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। প্রায় দেড় দশক আগে দুই দেশ বাণিজ্য উদারীকরণসংক্রান্ত একটি চুক্তি করে, যার পর থেকে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ককে ‘বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বে’ উন্নীত করা হয়।
এরপর দুই দেশের সহযোগিতায় কয়েকটি বড় প্রকল্প শুরু হয়। এর মধ্যে অন্যতম মুম্বাই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্প, যেখানে জাপানের শিনকানসেন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে বর্তমান পর্যায়ে ভারত-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জুলাইয়ে দিল্লিতে ভারত ও জাপানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রথম সরকারি দিল্লি সফরের সময় আয়োজিত ওই সম্মেলনে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ১২০টি চুক্তির আওতায় ভারতে ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। সেমিকন্ডাক্টর, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি এবং অন্যান্য খাতে এ অর্থ বিনিয়োগ হওয়ার কথা রয়েছে।
ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল বলেছেন, ভারতে ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, জাপান নির্ধারিত সময়ের আগেই তা পূরণ করতে পারে।
ভারতের বাজারে আগ্রহ বাড়ছে জাপানের ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলোরও। এ ক্ষেত্রে জাপানের হামামাতসু শহর একটি উদাহরণ। সুজুকি, হোন্ডা ও ইয়ামাহার মতো বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শহরটির সম্পর্ক রয়েছে এবং সেখানে উৎপাদন খাতের ছোট ও মাঝারি কোম্পানির সংখ্যাও বেশি।
এসব প্রতিষ্ঠানকে ভারতের বাজারে প্রবেশে সহায়তা করতে সম্প্রতি ‘হামামাতসু ইন্ডিয়া কমিটি’ গঠন করেছে শহর কর্তৃপক্ষ। এই কমিটির উদ্দেশ্য হলো হামামাতসুর ছোট কোম্পানিগুলো কীভাবে ভারতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে, সে বিষয়ে পথ খুঁজে বের করা।
ভারতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি চীনে জাপানের নিট বিনিয়োগ কমে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অর্থ এই নয় যে জাপানি কোম্পানিগুলো একযোগে চীন ছেড়ে ভারতে চলে যাচ্ছে।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের তোশিরো নিশিজায়েওয়া লিখেছেন, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা বিভিন্ন বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশলই এর পেছনে কাজ করছে। অর্থাৎ ব্যবসায়িক ঝুঁকি কমাতে নতুন বাজারে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে।
সিডনিভিত্তিক লোয়ি ইনস্টিটিউটের ভারতবিষয়ক চেয়ার শ্রুতি পান্ডালাই বলেন, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পর জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে। তার মতে, চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে ভারত একটি বিকল্প বাজার হিসেবে সামনে এসেছে। একই সঙ্গে জাপানের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার লক্ষ্য এবং ভারতের উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জাপানে রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব কমেনি; বরং সহযোগিতা আরও বেড়েছে। পান্ডালাইয়ের মতে, নতুন সরকার আসার পরও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের লক্ষ্য হ্রাস পায়নি। এতে বোঝা যায়, ভারত-জাপান সম্পর্ক এখন শুধু দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী মহল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যেও এই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে চাপের মুখে থাকা ভারতের জন্য জাপানের নতুন বিনিয়োগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত বাড়ছে। ফলে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে জাপানের মতো দেশের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শ্রুতি পান্ডালাইয়ের মতে, ভারত ও জাপানের সহযোগিতা দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে এই সম্পর্কের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সহজ হবে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে ব্যবসা পরিচালনায় এখনো করসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জমি ও পরিবেশের অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগার মতো সমস্যা রয়েছে। জাপানি বিনিয়োগকারীরাও এসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন।
ভারতের বুলেট ট্রেন প্রকল্পকে এর একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্প্রতি জাপানের সাবেক এক মন্ত্রী প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিলম্বের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন। তার অভিযোগ ছিল, ভারত বারবার নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং কিছু প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাচ্ছে। ভারত সরকার অবশ্য দ্রুত ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও ঘটনাটি তুলে ধরে ভারতের সঙ্গে করা চুক্তি বাস্তবায়নে সমস্যার উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করে।
ভারত ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ বাড়লেও এই প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখা ভারতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জাপানি কোম্পানিগুলো ক্রমেই ভারতকে চীনের বিকল্প বাজার এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে দেখছে।
জাপানের অভ্যন্তরীণ বাজার সংকুচিত হওয়া, চীনে ব্যবসার ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ—সব মিলিয়ে ভারতের গুরুত্ব জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বাড়ছে। তবে এই আগ্রহ দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে ভারতে ব্যবসার পরিবেশ আরও সহজ করতে হবে। করব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, জমি ও পরিবেশের অনুমোদন এবং বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের মতো সমস্যাগুলো কমানো জরুরি।