নিউজ বাংলা ডেস্ক : নেপাল ও চীনে হিমবাহ ধসের ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৭৯৭ জনে দাঁড়িয়েছে। দুই দেশে এখনো ৩ হাজার ৪৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হলেও প্রতিকূল আবহাওয়া, ভারী বৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং কাদা-ধ্বংসাবশেষের কারণে অভিযান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বুধবার হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর বরফ, পাথর, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত পাহাড়ি উপত্যকা ও নদীপথ দিয়ে নেমে আসে। এতে নেপাল ও চীনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। রেড ক্রসের হিসাব অনুযায়ী, দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন। চীন জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গেও এই দুর্যোগের যোগসূত্র রয়েছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে এ পর্যন্ত ৭৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৫০২ জন। চীনের গিরং কাউন্টিতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন, নিখোঁজ আরও ৫৪৬ জন। এছাড়া তিব্বতে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে চীন।
রোববারও দুই দেশের উদ্ধারকারী দল দুর্গম এলাকাগুলোতে অভিযান চালিয়েছে। তবে নতুন করে বৃষ্টিপাত ও বজ্রঝড়ের আশঙ্কায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। নেপালের স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ত্রিশূলী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীদের উঁচু এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুক্রবার থেকে প্রতিকূল আবহাওয়া ও বন্যার ঝুঁকির কারণে কয়েক দফা উদ্ধার অভিযান স্থগিত রাখতে হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই শনিবার নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির প্রতিবেদনে ওয়াং ই এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে ভয়াবহ সীমান্তপারের দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, উদ্ধার কার্যক্রম নজিরবিহীনভাবে কঠিন ও জটিল হয়ে উঠেছে।
এদিকে নেপাল-চীন সীমান্তে দুর্যোগের পর একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। এর পানি উপচে লেন্দে খোলা ও ত্রিশূলী নদীতে পড়লে নতুন বন্যার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। সিসিটিভি জানিয়েছে, ভাটির এলাকার জন্য ঝুঁকি তৈরি করা হ্রদটির বেশির ভাগ পানি শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে বের হয়ে যায়। তবে শনিবার রাতে ড্রোনে হ্রদটির প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার ভাটিতে একটি ভূমিধস শনাক্ত হয়। সেখানে ভূমিধসের কারণে নতুন একটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হওয়ায় আবারও পানি জমতে শুরু করেছে।
নেপালে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে ঘিরে উদ্ধার তৎপরতা আরও বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আপার ত্রিশূলী প্রকল্প। কর্তৃপক্ষের শুক্রবারের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির একটি সুড়ঙ্গে প্রায় ৩৫০ জন আটকা পড়ে থাকতে পারেন।
তাদের উদ্ধারে রোববার নেপালের সেনাবাহিনী দুর্গম এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে যায়। উদ্ধারকারী দল একটি সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখে পৌঁছে জমে থাকা কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ শুরু করেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রবেশপথ নিরাপদ করা সম্ভব হলে সেখানে অক্সিজেন সরবরাহ করা হবে। এরপর ক্যামেরা নিয়ে উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করবেন।
নেপালে প্রায় ১০ হাজার সেনা উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। তাদের সঙ্গে চীন ও ভারতের বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দলও কাজ করছে। জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান ধরম রাজ উপ্রেতি জানান, সুড়ঙ্গের সামনে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। সেখানে পথ তৈরির জন্য বিস্ফোরক ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
অন্যদিকে, কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। হাসপাতাল, মর্গ ও ত্রাণকেন্দ্রে তাদের স্বজনদের সন্ধান করছেন তারা। শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি—এমন শত শত মরদেহ পচতে শুরু করায় সেগুলো গণকবর দেওয়া শুরু করেছে নেপালের কর্তৃপক্ষ।
দুর্যোগকবলিত এলাকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ান জেলার দেবঘাটের একটি জঙ্গলে এসব মরদেহ দাফনের জন্য শত শত কবর খোঁড়া হয়েছে। জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল জানান, মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। এ অবস্থায় দাফন করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না।
শনিবার শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এমন ৯৬টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। রোববার আরও ১০০টির বেশি মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা ছিল। একই সঙ্গে নদী ও ধ্বংসাবশেষের মধ্য থেকে আরও মরদেহ উদ্ধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
পরবর্তী সময়ে মরদেহ শনাক্ত করার সুযোগ রাখতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। কোন মরদেহ কোথায় দাফন করা হয়েছে, সেই তথ্যও সংরক্ষণ করছে কর্তৃপক্ষ। নেপালের পুলিশ কর্মকর্তা অনিল থাপা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মরদেহের অর্ধেকের বেশি শনাক্ত করার অবস্থায় নেই। অনেক মরদেহের মুখ চেনার উপায় নেই; কোথাও শুধু হাত-পা, আবার কোথাও শরীরের আংশিক অংশ পাওয়া গেছে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী জানিয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে সুড়ঙ্গে আটকে পড়াদের উদ্ধার, ডিএনএ পরীক্ষা, মরদেহ সংরক্ষণের জন্য হিমায়িত ব্যবস্থা এবং পচে যাওয়া মরদেহ শনাক্তে ফরেনসিক পরীক্ষা।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে হিমবাহের অস্থিতিশীলতার সঙ্গে এই দুর্যোগের সম্পর্ক রয়েছে। তিব্বত মালভূমিতে হিমবাহ ও বরফনির্ভর প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চীনা বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে সিসিটিভি জানায়, নেপালের দিক থেকে আসা কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত গিরং সীমান্ত এলাকায় পৌঁছাতে মাত্র ছয় থেকে সাত মিনিট সময় নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে প্রবল পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে যেতে দেখা গেছে। প্রাণ বাঁচাতে মানুষকে নিরাপদ স্থানের দিকে ছুটতেও দেখা যায় এসব ভিডিওতে।
চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি ২ হাজার ১০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে। ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান বা প্রায় ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকায় কাজ করা উদ্ধারকারীদের কাছে আকাশপথে সরঞ্জাম ও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নিখোঁজদের সন্ধানে চীনা সেনাবাহিনী জীবন শনাক্তের বিশেষ যন্ত্রও ব্যবহার করছে।
নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। তবে আবহাওয়ার অবনতি, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং নতুন ভূমিধসের আশঙ্কার কারণে উদ্ধারকারীদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।