নিউজ বাংলা ডেস্ক : দেশের অর্থনীতি ও শিল্পায়নে ব্যবসায়ীদের প্রকৃত অবদানকে আরও গুরুত্ব দিয়ে বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) নির্বাচনের নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। ব্যবসার আকারের পাশাপাশি উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মুনাফা, কর-ভ্যাট প্রদানসহ পরিমাপযোগ্য ও যাচাইযোগ্য অবদানকে এবার মূল্যায়নের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
২০০৮ সালের নীতিমালা সংশোধন করে গত ২৩ আগস্ট ‘বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (শিল্প) নির্বাচন নীতিমালা ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এতে সিআইপি নির্বাচনের ক্ষেত্রে উৎপাদন, বিনিয়োগ, মুনাফা, কর ও ভ্যাট পরিশোধ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে নম্বর দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতি বছর শিল্প খাতে বেসরকারি পর্যায়ে শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্য থেকে সিআইপি নির্বাচিত করা হবে। জাতীয় শিল্প উন্নয়ন পরিষদের (এনসিআইডি) পদাধিকারী বেসরকারি সদস্যদের জন্য নির্ধারিত কোটার পাশাপাশি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমেও এই মর্যাদা দেওয়া হবে।
শিল্প খাতে মোট সিআইপির সংখ্যা ৫৫ জন নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন খাতে ১৫ এবং সেবা খাতে পাঁচজন, মাঝারি শিল্পের উৎপাদন খাতে ১০ ও সেবা খাতে তিনজন এবং ক্ষুদ্র শিল্পের উৎপাদন খাতে চার ও সেবা খাতে দুজন থাকবেন। এছাড়া উদীয়মান প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে পাঁচজন, হাইটেক শিল্পে তিনজন, লজিস্টিকস ও পর্যটন শিল্পে দুজন করে এবং মাইক্রো ও কুটির শিল্পে দুজন সিআইপি নির্বাচিত হবেন।
১০০ নম্বরে হবে মূল্যায়ন
সিআইপি নির্বাচনের জন্য প্রাথমিক বাছাই কমিটি ও চূড়ান্ত মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হবে। এসব কমিটি বিভিন্ন নির্ধারিত সূচকের ভিত্তিতে আবেদনকারীদের সর্বোচ্চ ১০০ নম্বরে মূল্যায়ন করবে।
বৃহৎ ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে প্রকৃত উৎপাদনে ২০ নম্বর, পরিশোধিত মূলধন ও দীর্ঘমেয়াদি মোট বিনিয়োগে ১০, কর ও ভ্যাট পরিশোধে ১৫, জনবলে ১০, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ১০ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১০ নম্বর রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, রপ্তানি আয়, স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার, গবেষণা ও উন্নয়নসহ অন্যান্য সহযোগী সূচকও মূল্যায়নে যুক্ত থাকবে।
ক্ষুদ্র শিল্পে প্রকৃত উৎপাদন ও স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেবা খাতে মোট বিনিয়োগের জন্য ২৫, কর ও ভ্যাট পরিশোধে ১৫, লেনদেনে ১০ এবং আয়কর-পূর্ববর্তী মুনাফায় ১০ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। মেধাস্বত্ব, প্রযুক্তির ব্যবহার ও উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, পরিবেশ এবং মানদণ্ডও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় শুধু প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার আকার নয়, উদ্যোক্তার বাস্তব অর্থনৈতিক অবদান, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মুনাফা, কর প্রদান, স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার, মান বজায় রাখা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণা ও উন্নয়নের বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সিআইপিরা যেসব সুবিধা পাবেন
সিআইপি মর্যাদা পাওয়া ব্যবসায়ীরা এক বছর বিভিন্ন সরকারি সুবিধা ভোগ করবেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পরিচয়পত্র সচিবালয়ে প্রবেশের পাস হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। জাতীয় অনুষ্ঠান ও সিটি করপোরেশনের নাগরিক সংবর্ধনায় তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হবে।
ব্যবসায়িক প্রয়োজনে আকাশ, রেল, সড়ক ও নৌপথে সরকারি পরিবহনে আসন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাঁরা অগ্রাধিকার পাবেন। বিদেশে ভ্রমণের সময় ভিসার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে চিঠি দেবে।
সিআইপি নিজে, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের সরকারি হাসপাতালে কেবিন পাওয়ার ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার থাকবে। বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ-২ ব্যবহারের সুবিধাও দেওয়া হবে। সরকার প্রয়োজন মনে করলে সিআইপিকে তাঁর মেয়াদকালে শিল্পবিষয়ক নীতিনির্ধারণী কমিটির সদস্য করতে পারবে।
যারা সিআইপি হতে পারবেন না
ঋণখেলাপি ব্যক্তি কিংবা যথাযথভাবে শুল্ক, ভ্যাট বা আয়কর পরিশোধ না করা ব্যক্তিরা সিআইপি হওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না। বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে শিল্প বিরোধ থাকলে এবং সেই বিরোধ নিষ্পত্তিতে আগ্রহ না থাকলেও আবেদন করা যাবে না।
ফৌজদারি অপরাধে সাজা হওয়ার পর পাঁচ বছর পূর্ণ না হলেও আবেদনকারী অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। একইভাবে শেয়ার কেলেঙ্কারিতে জড়িত ব্যক্তি এবং নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজন বা লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারাও এই মর্যাদা পাওয়ার সুযোগ পাবেন না। আবেদনপত্রে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হলে পরবর্তী তিন বছর সিআইপির জন্য আবেদন করা যাবে না।
একই বছরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অন্য কোনো পুরস্কার অথবা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের সিআইপি মর্যাদা পাওয়া ব্যক্তি এই সম্মাননার জন্য নির্বাচিত হতে পারবেন না। একবার সিআইপি নির্বাচিত হওয়ার পর পরবর্তী দুই বছরও এই মর্যাদা পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
এ ছাড়া গত পাঁচ বছরে রাজস্ব ফাঁকির কারণে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানকে সরকার জরিমানা করে থাকলে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক, উদ্যোক্তা পরিচালক বা চেয়ারম্যানও সিআইপি হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন না।
নতুন নীতিমালায় প্রতি বছর ১৫ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ ও বাছাইয়ের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক তালিকা তৈরির পর আবেদনকারীদের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।