
নিজস্ব প্রতিবেদন
তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ অবশ্য নতুন নয়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তার শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। সেদিনই তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ব্যক্তিগত চিঠি তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন, যেখানে সুবিধাজনক সময়ে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। ভারতের সরকারি বিবৃতিতেও বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর ভারত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অর্থাৎ দ্বিপক্ষীয় সফর চূড়ান্ত না হলেও বহুপক্ষীয় একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে তারেকের দিল্লি যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠেছে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ঢাকার পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। ৫ আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে অনলাইনে যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাও বাংলাদেশ ভালোভাবে নেয়নি। ওই ঘটনায় ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।
অন্যদিকে দিল্লির অবস্থান হলো—বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ-অনুরোধ তারা বিবেচনা করছে। তবে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে যে বক্তব্য দিচ্ছেন, সেটিকে ভারত সরকারের বক্তব্য বা অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
৫ আগস্টের বক্তব্যে শেখ হাসিনা বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের সমালোচনা করেন এবং ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান। একই সঙ্গে তিনি তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
এই ঘটনাই ঢাকা-দিল্লির মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সংকটকে আরও গভীর করেছে।
তারেক রহমানের সঙ্গে গত ১০ আগস্ট সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। এর আগে এক অনুষ্ঠানে তিনি প্রকাশ্যেই দুই দেশের সম্পর্ককে অতীতের বিরোধে আটকে না রেখে সামনে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
ভারতের অবস্থান মোটামুটি স্পষ্ট—শেখ হাসিনার বিষয়টি তার নিজস্ব কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় চলতে পারে, কিন্তু সেটিকে ভারত-বাংলাদেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ওপর স্থায়ী বাধা হিসেবে রাখা উচিত নয়।
দিল্লির ধারণা, প্রত্যর্পণ প্রশ্নে আলোচনার পাশাপাশি শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খুঁজে বের করা সম্ভব। বিশেষ করে তিনি নিজেই ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা বলায়, সেটিকে একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ঢাকার সমস্যা অন্য জায়গায়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শেখ হাসিনা এখনো অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি নাম। ফলে তার উপস্থিতি থাকা অবস্থায় ভারত সফরে গেলে দেশের অভ্যন্তরে তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা ঢাকার নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে ভারতের আগ্রহের পেছনে কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নেই; রয়েছে একাধিক বাস্তব স্বার্থ।
দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রকল্প, বাণিজ্যিক ইস্যু, পানি বণ্টন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়গুলো জটিল হয়ে আছে। বিশেষ করে গঙ্গার পানি চুক্তির নবায়ন এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত নানা বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একই সময়ে ঢাকা বেইজিংয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করছে। তারেক রহমানের চীন সফরের পর দিল্লির কাছে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে ভারতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্রুত রাজনৈতিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন এখন কৌশলগত প্রয়োজনও।
দ্বিপক্ষীয় সফর আপাতত আটকে থাকলেও ব্রিকস সম্মেলন তারেক রহমানের জন্য দিল্লি যাওয়ার একটি তুলনামূলক সহজ পথ তৈরি করেছে।
ভারত ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করছে। বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে তারেক রহমানকে আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানোর ফলে তার সফরটি সরাসরি দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সফরের বদলে একটি বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেখানো সম্ভব হবে।
এ ধরনের ফোরামের বাড়তি সুবিধা হলো, সেখানে কোনো একটি দ্বিপক্ষীয় বিরোধকে সফরের একমাত্র এজেন্ডা বানানোর প্রয়োজন হয় না। বরং আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফাঁকে দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠকের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সেই অর্থে তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে গেলে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার বৈঠকের সম্ভাবনাও স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের বর্তমান অচলাবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে শেখ হাসিনা ইস্যু এবং তাকে ঘিরে দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাস।
ঢাকা চাইছে, তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আগে ভারত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করুক যাতে সফরটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। অন্যদিকে দিল্লি চাইছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নকে সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পূর্বশর্ত না বানিয়ে অন্য বিষয়গুলোতেও আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হোক।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও অবশ্য ভারত সফরের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। ১৩ আগস্ট পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছিলেন, সরকার সব দেশের সফরের ব্যাপারে ইতিবাচক; তবে সময় নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি এবং দুই দেশের আলোচনার অগ্রগতির ওপর।
অর্থাৎ, দিল্লির আমন্ত্রণ এখনো বহাল, ঢাকার আগ্রহও একেবারে অস্বীকার করা যাচ্ছে না। কিন্তু শেখ হাসিনা ইস্যুতে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতা ছাড়া সেই সফর বাস্তবায়ন কঠিন।
সেপ্টেম্বরে ব্রিকসের মঞ্চ তাই দুই দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত নয়াদিল্লি যান কি না, আর গেলে মোদির সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কের জমে থাকা বরফ কতটা গলানো যায়—সেদিকেই এখন নজর ঢাকা ও দিল্লি উভয়ের।