নিউজ বাংলা ডেস্ক : তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ছয় মাস পূর্ণ করেছে। এই সময়ে সরকার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনার ভিত্তিতে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্য ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই নীতির কেন্দ্রে থাকা উচিত দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হলো—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারেক রহমান এই নীতির সঙ্গে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ধারণা যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত দেশের জনগণের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে, সেটিকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিবেশী পরিবর্তনের সুযোগ নেই। সুসম্পর্ক দুই দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্বাধীনতার পর দুই দেশের সম্পর্ক বিভিন্ন সময় উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। সেই দূরত্ব কমাতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর ২১ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমান ভারত সফর করেন। মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য তাকে ভারত সফরে না যাওয়ার পরামর্শ দিলেও তিনি দেশের জনগণের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের আমন্ত্রণে ভারত সফর করে তিনি গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এখনো ওই চুক্তিকে পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের পর ভারত সফর করেন বেগম খালেদা জিয়া। ভারত তাকে ঐতিহাসিক সম্মান দেয়। ২০০৬ সালেও তিনি ভারত সফর করেন। তবে ২০১২ সালে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তার সাত দিনের ভারত সফর ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওই সফরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ছাড়াও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে তিনি বৈঠক করেন এবং সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা পান।
সে সময় বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের শরিক জামায়াত এবং বিএনপির কয়েকজন নেতা তাকে ভারত সফর না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া নিজের সিদ্ধান্তেই ভারত সফর করেন। ওই সফরে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিএনপি কখনো ভারতবিরোধিতার রাজনীতি করে না।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া—দুজনের কূটনৈতিক নীতিতেই বাংলাদেশের স্বার্থ অগ্রাধিকার পেয়েছে। জিয়াউর রহমান অবকাঠামো উন্নয়নে জাপান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ তৈরি করেন। ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক সহযোগিতার পথও প্রসারিত করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিকেই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কূটনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
বর্তমানে তারেক রহমান জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। দেশের স্বার্থের প্রশ্নে তিনি অন্যের ভুল পরামর্শ গ্রহণ করবেন না—এমন প্রত্যাশা রয়েছে। দেশের কল্যাণে নিজের বিবেচনায় তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও আশা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভুল পথে পরিচালিত হয়েছিল বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের স্বার্থের পরিবর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তার বৈশ্বিক প্রচারণার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ওই সময় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে অনেকটা একলা হয়ে পড়েছিল বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. ইউনূস বলেছিলেন, ‘বিশ্ব আমাদের কাছে আসবে।’ কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি বলে দাবি করা হয়েছে। বরং বাংলাদেশকে বিশ্বে অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পাকিস্তান ছাড়া অন্য কোনো দেশের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয়নি বলেও লেখাটিতে বলা হয়েছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়নি। বরং বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। দেড় বছরে কোনো দেশের ভিসা সেন্টার দিল্লি থেকে ঢাকায় আনা সম্ভব হয়নি, ফলে বিদেশে পড়তে যেতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বেড়েছে। একই সময়ে যেসব দেশে বাংলাদেশিদের ভিসা ছাড়া প্রবেশের সুযোগ ছিল, সেসব দেশের অধিকাংশই সেই সুবিধা বাতিল করেছে এবং অন্য অনেক দেশ ভিসা দেওয়ার হার কমিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখাটিতে আরও দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান ইয়েমেন, আফগানিস্তান বা ফিলিস্তিনের পর্যায়ে নেমে গেছে। দেড় বছরে ১৪ বার এবং প্রথম ১২ মাসে ১১ বার বিদেশ সফর করেও ‘ইউনূস ম্যাজিক’ কার্যকর হয়নি বলে মন্তব্য করা হয়েছে। ৫ আগস্টের পর ভারতবিরোধী বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত করার অভিযোগও করা হয়েছে।
তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বাংলাদেশে ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিক অবৈধভাবে কাজ করছেন বলে দাবি করেছিলেন। পরে ওই বক্তব্যের কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ভারতের সঙ্গে সব ধরনের অসম চুক্তি বাতিলের কথা বললেও দেড় বছরে কোনো চুক্তি বাতিল হয়নি। একইভাবে জ্বালানি উপদেষ্টা আদানির সঙ্গে চুক্তি বাতিলের কথা বললেও পরে এ বিষয়ে আর কোনো বক্তব্য দেননি বলে দাবি করা হয়েছে।
গত বছরের ২৬ থেকে ২৯ মার্চ চার দিনের চীন সফরে গিয়ে ২৮ মার্চ বেইজিংয়ের ‘দ্য প্রেসিডেন্সিয়াল’-এ চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে এক সংলাপে ড. ইউনূস সেভেন সিস্টার্স নিয়ে মন্তব্য করেন। ওই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, এ ধরনের বক্তব্যের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে।
এরপর বাংলাদেশের পণ্যের জন্য ভারতের বন্দর ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, যার ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ৫ আগস্টের পর ভারতের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। মেডিক্যাল ভিসা চালু থাকলেও তা সহজলভ্য ছিল না। একই সময়ে সীমান্তে থেমে থেমে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং পুরো সময়জুড়েই বাংলাদেশে ভারতবিরোধী প্রচারণা ছিল বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির প্রভাব ক্রীড়াঙ্গনেও পড়ে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ অংশ নেয়নি। এতে বাংলাদেশের ক্রিকেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশের ভাবমূর্তিও আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে লেখাটিতে বলা হয়েছে। একই সময়ে ভারত জানিয়ে দেয়, তারা বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় রয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর বাংলাদেশে এসে প্রধানমন্ত্রী ও বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে সমবেদনা জানান। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে অভিনন্দন জানান এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এরপর ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরালা তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন উপলক্ষে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে একাধিক শুভেচ্ছাবার্তা পাঠান এবং তাকে সুবিধাজনক সময়ে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান।
দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ভারত আরও কয়েকটি পদক্ষেপ নেয় বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটি সাবেক মন্ত্রী ও শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ দিনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। বাংলাদেশে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করেন। দেড় বছর বন্ধ থাকার পর ভারতের ভিসা কার্যক্রম শুরু হওয়াকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
দিনেশ ত্রিবেদী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দেন। পরে দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে তিনি বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। জ্বালানি সংকটের সময়ও ভারত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে আরও জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি ভারত সরকার বিবেচনা করছে বলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন।
বাংলাদেশে কাঁচা মরিচের দাম বেড়ে গেলে ভারত থেকেও সহযোগিতা আসে। দেশটি থেকে কাঁচা মরিচ আমদানির পর বাংলাদেশের বাজারে দাম সহনীয় হয়। ভারতের হাইকমিশনার ও পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করলে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হবে।
বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ থাকা প্রয়োজন বলে লেখাটিতে মত দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক হলেও তা সমাধানের পথ আলোচনার মাধ্যমেই খুঁজে নিতে হবে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে বসলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। কূটনীতিতে জেদ বা মান-অভিমানের সুযোগ নেই; আলোচনার টেবিলেই বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশের উৎপাদন খাতের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে। তুলা, সুতা, কাপড়, রাসায়নিক, রং, যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন শিল্প উপকরণে বাংলাদেশ ভারতের ওপর নির্ভরশীল। সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। চীন বা দূরবর্তী বাজার থেকে বিকল্প পণ্য আনতে গেলে পরিবহন ব্যয় ও সময় বাড়বে এবং বেশি পরিমাণ পণ্য মজুত করতে হবে। এতে ভারতের ভৌগোলিক নৈকট্য থেকে পাওয়া সুবিধা কমে যাবে এবং বাংলাদেশের রপ্তানি আরও কম প্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়বে।
সড়ক, রেল, নৌপথ ও সীমান্ত বাণিজ্যের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ আঞ্চলিক বাজার ও শিল্প উপকরণে কম খরচে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে। দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হলে এসব সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকারও অনেকাংশে ভারতের ভূখণ্ড ও ট্রানজিট ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে সম্পর্কের অবনতিতে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার। দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা পানিবণ্টন, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ট্রানজিট ও বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশকে দূরবর্তী অংশীদারদের ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে এবং ব্যবসায়িক ব্যয়ও বাড়তে পারে।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্পর্ক দুর্বল হলে সীমান্ত সংঘাত, চোরাচালান, মানব পাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন বাড়তে পারে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা কমে গেলে আন্তঃসীমান্ত জঙ্গি ও বিদ্রোহী নেটওয়ার্ক সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
ভারতের সঙ্গে বৈরিতা বাংলাদেশকে চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক বা অন্যান্য শক্তির দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে বাধ্য করতে পারে, যা আঞ্চলিক কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করবে বলে লেখাটিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র হলে উগ্র জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক বিভাজন ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।
ভারতের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে লেখাটিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বাণিজ্য, জ্বালানি কিংবা শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দ্রব্যমূল্য ও বেকারত্ব বাড়তে পারে, যার রাজনৈতিক দায় সরকারকেই নিতে হতে পারে।
অতিরিক্ত আগ্রাসী ভারতবিরোধী অবস্থান উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী শক্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে সংঘাতমূলক নীতি মধ্যপন্থী জনগোষ্ঠী ও ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা ঢাকার কৌশলগত পরিসরও সংকুচিত করতে পারে এবং অন্য শক্তিগুলোর ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বাড়তে পারে।
লেখাটিতে বলা হয়েছে, বিএনপির জন্য অতিরিক্ত ভারতবিরোধী পররাষ্ট্রনীতি একটি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক বিরোধকে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও নির্বাচনি বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে সরকারের ভেতরে একটি অংশ দেশের স্বার্থের পরিবর্তে উগ্র ভারতবিরোধিতার দিকে সরকারকে ঠেলে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কূটনীতিতে কৌশলগত স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে, একটি ইস্যুর কারণে সব স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার পথ বন্ধ করা উচিত নয়। বিএনপি একটি উদার গণতান্ত্রিক দল হওয়ায় সরকারকে যারা ভারতবিরোধী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, তাদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। দেশের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন—এমন প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে লেখাটির সমাপ্তি টানা হয়েছে।
অদিতি করিম : লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল : auditekarim@gmail.com