নিউজ বাংলা ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর সাউথ শিকাগো চ্যাপেলে ৫৬টি মরদেহ যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করে রাখার ঘটনা সামনে এসেছে। এর মধ্যে কয়েকটি মরদেহ বিভিন্ন মাত্রায় পচে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনাটি তদন্ত করছে পুলিশ। পাশাপাশি ব্যবস্থা নিয়েছে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কুক কাউন্টি মেডিকেল পরীক্ষকের কার্যালয় জানিয়েছে, ইলিনয় ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার সৎকার কেন্দ্রটিতে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মরদেহ পরীক্ষার বিশেষজ্ঞদের পাঠানো হয়। তাঁরা মরদেহগুলোর অবস্থা পরীক্ষা করার পাশাপাশি মৃত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের নথি ও মৃত্যুসনদ খুঁজে দেখছেন। পরিচয় নিশ্চিত করতে এবং পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। এরপর সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানানো হবে।
ঘটনার পর সৎকার কেন্দ্রটির একজন পরিচালকের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। ইলিনয় আর্থিক ও পেশাগত নিয়ন্ত্রণ বিভাগ জানিয়েছে, সৎকার পরিচালক ইয়োহানা মরগান একাধিক মৃত ব্যক্তির মরদেহ ফ্রিজ ছাড়া একটি খারাপ অবস্থার জায়গায় রেখেছিলেন। সেখানে ইঁদুরের উপদ্রবও ছিল। এর ফলে মরদেহগুলো পচে গিয়ে তাতে পোকামাকড়ের লার্ভা জন্ম নেয়। জননিরাপত্তা, জনস্বার্থ ও মানুষের কল্যাণের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় বুধবার তাঁর লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
ইলিনয়ের ব্যবসায়িক নথি অনুযায়ী, ইয়োহানা মরগান ২০২২ সালে সাউথ শিকাগো চ্যাপেল ইনকরপোরেটেড প্রতিষ্ঠা করেন। একই নথিতে তাঁর স্বামী ক্লার্ক মরগানকে প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মরগান দম্পতির বিরুদ্ধে এর আগেও সৎকার-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। ইলিনয়ের নিয়ন্ত্রক সুসানা মেন্ডোজা জানান, ইয়োহানা ও ক্লার্ক আগে শিকাগোর দক্ষিণে শিকাগো হাইটস এলাকায় একটি মরদেহ দাহ কেন্দ্র পরিচালনা করতেন। সেখানেও যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা মরদেহ এবং দাহের পর পরিবারের কাছে ফেরত না দেওয়া শত শত মানুষের দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল। এসব ঘটনার পর গত বছর ওই প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়।
এ ছাড়া ইলিনয়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ক্লার্ক মরগানের সৎকার পরিচালকের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিল। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও লাইসেন্স ছাড়া কাজ করা এবং ‘অপেশাদার আচরণের’ অভিযোগে তাঁর লাইসেন্স বাতিল করা হয়। তবে সেই আচরণের বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সাউথ শিকাগো চ্যাপেলে মরদেহ পাওয়ার কয়েক মাস আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিষ্ঠানটি থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। শুক্রবারও সৎকার কেন্দ্রটির বাইরে স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনদের বিষয়ে তথ্য জানতে আসা কয়েকজন মানুষ জড়ো হন।
৫৫ বছর বয়সী লাতাশা জনসন জানান, বৃহস্পতিবার ওই সৎকার কেন্দ্রে তাঁর মায়ের শেষকৃত্য হয়েছিল। পরে কর্মকর্তারা সেখানে মরদেহ পাওয়ার বিষয়টি জানালে তিনি জানতে পারেন, তাঁর মায়ের মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে হবে। এক বা দুই দিনের মধ্যে তাঁকে মায়ের মরদেহ শনাক্ত করতে হতে পারে বলেও জানান তিনি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জনসন বলেন, তিনি কী করবেন বুঝতে পারছেন না এবং তাঁর হৃদয় ভেঙে গেছে।
এলাকার সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্লেইজ ফন ব্রুখহয়জার বলেন, কয়েক মাস ধরে ওই সৎকার কেন্দ্র থেকে ভয়াবহ দুর্গন্ধ আসার অভিযোগ ছিল। সেখানে পচে যাওয়া মরদেহ পাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত কষ্টদায়ক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঘটনাটি তদন্ত করছে শিকাগো পুলিশ। শুক্রবার পুলিশ জানায়, আগে দেওয়া একটি বিবৃতিতে ভুল তথ্য ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, দমকল বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলকে বিপজ্জনক পদার্থের ঘটনা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। পরে পুলিশ স্পষ্ট করে জানায়, এমন কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। সৎকার কেন্দ্রটির বক্তব্য জানতে ফোন ও প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সুসানা মেন্ডোজা এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে অত্যন্ত নিন্দনীয় ও হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, মৃতরা প্রত্যেকেই কারও মা, বাবা, বোন, ভাই, সন্তান বা বন্ধু; তাঁদের আরও ভালো আচরণ পাওয়ার অধিকার ছিল। কুক কাউন্টির আদালতের নথিতে হাইটস ক্রিমেটরি-সংক্রান্ত একটি মামলায় ইয়োহানা ও ক্লার্ক মরগানের নাম আসামি হিসেবে রয়েছে।
এদিকে শুক্রবার মরগান দম্পতির সরকারি নথিতে থাকা ফোন নম্বর এবং তাঁদের ব্যবসায়িক প্রতিনিধি হিসেবে তালিকাভুক্ত আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। সরকারি নথি অনুযায়ী, তাঁরা শিকাগোর উপশহর এভারগ্রিন পার্কে বসবাস করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে গত তিন বছরে মরদেহ ও দেহাবশেষ যথাযথভাবে সংরক্ষণ বা ব্যবস্থাপনা না করার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। গত মাসে কলোরাডোর পুয়েবলোতে একটি সৎকার কেন্দ্রের গোপন দরজার পেছনে অন্তত ২৪টি পচে যাওয়া মরদেহ ও অন্যান্য দেহাবশেষ পাওয়ার ঘটনায় দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর আগে ২০২৪ সালে জর্জিয়ার একটি সৎকার কেন্দ্রে বিভিন্ন মাত্রায় পচে যাওয়া ১৮টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০২৩ সালে কলোরাডোর একটি ভবনে প্রায় ২০০টি পচে যাওয়া মরদেহ এবং একই বছর ইন্ডিয়ানার একটি সৎকার কেন্দ্র থেকে ৩১টি মরদেহ পাওয়া যায়।
সাউথ শিকাগো চ্যাপেলে পাওয়া ৫৬টি মরদেহের পরিচয় শনাক্তের কাজ বর্তমানে চলছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের স্বজনদের বিষয়ে তথ্য দেওয়ার প্রক্রিয়াও চালাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।