নিউজ বাংলা ডেস্ক : ন্যাটো জোটের ঐক্য ও প্রতিক্রিয়া যাচাই করতে সদস্য কোনো দেশের ওপর সীমিত পরিসরে হামলা চালাতে পারেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন। আমেরিকান সংবাদপত্র ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে সাইবার হামলা, গোপন অভিযান এবং ছোট আকারের সামরিক অনুপ্রবেশসহ একাধিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে মার্কিন গোয়েন্দারা।
ওয়াশিংটনের এই মূল্যায়নকে আগের অবস্থানের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত থাকার কারণে পুতিন ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চাইবেন না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ধারণা থেকে সরে এসেছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার সামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ অগ্রযাত্রার গতি কমে যাওয়ার কারণে মস্কোর ওপর বিভিন্ন দিক থেকে চাপ বাড়ছে।
তাদের ধারণা, ন্যাটোর বিরুদ্ধে রাশিয়া কোনো পদক্ষেপ নিলে সেটির প্রধান উদ্দেশ্য ভূখণ্ড দখল করা নাও হতে পারে। বরং জোটের অভ্যন্তরীণ বিভাজন প্রকাশ্যে নিয়ে আসাই সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের গবেষক হিদার কনলি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাঁর মতে, ন্যাটোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তার মিত্রদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া রাশিয়ার দীর্ঘদিনের অন্যতম লক্ষ্য।
এরই মধ্যে ন্যাটোর আকাশসীমায় রাশিয়ার বিভিন্ন তৎপরতাকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন মার্কিন ও ইউরোপীয় নেতারা। এ ক্ষেত্রে পোল্যান্ডে রুশ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র গিয়ে পড়া এবং রোমানিয়ার আকাশসীমায় ড্রোন প্রবেশের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, পুতিনের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়লে মস্কো বিভিন্ন ধরনের আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে পারে। সম্ভাব্য এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ন্যাটো সদস্যদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাইবার হামলা, পরিচয়হীন সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে জোটের সীমান্তবর্তী ছোট কোনো এলাকা দখল এবং ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে সীমিত সামরিক উপস্থিতি তৈরি করা।
মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শরৎকাল থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে যেকোনো সময় এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
তবে সরাসরি স্থল হামলার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ এ ধরনের হামলা হলে ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’-এর যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। অন্যদিকে হাইব্রিড বা ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্রে ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া নিয়ে আইনি জটিলতার কারণে পরিস্থিতি কিছুটা অস্পষ্ট।
যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে ন্যাটো। জোটটির মুখপাত্র কর্নেল মার্টিন ও’ডনেল বলেন, তারা সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির জন্য পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ন্যাটো রাশিয়ার তৎপরতার ওপর নজর রাখছে এবং হামলা হলে তা প্রতিহত ও প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে রুশ হুমকি নিয়ে নতুন এই গোয়েন্দা মূল্যায়নের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়া এবং সম্প্রতি ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনার কারণে লং-রেঞ্জ প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল, ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (এটাকমস) ও স্টিঙ্গার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমেছে। একই সঙ্গে প্যাট্রিয়ট, এসএম-৩ ও থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও চাপের মধ্যে রয়েছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) সামরিক বিশেষজ্ঞ টম কারাকো বলেন, রাশিয়ার আগ্রাসন মোকাবিলায় স্টিঙ্গার ও এটাকমসের মতো ক্ষেপণাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সিএসআইএসের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র আনুমানিক ১,০৬০ থেকে ১,৪৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এর ফলে দেশটির হাতে প্রায় ৮৭০টি ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট থাকতে পারে।
পেন্টাগনের জয়েন্ট চিফসের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন হোয়াইট হাউসকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ক্রমেই কমছে। তবে পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের দাবি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যেকোনো কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে পর্যাপ্ত অস্ত্র রয়েছে। পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন বাড়াতে ঠিকাদারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।