নিউজ বাংলা ডেস্ক : দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এর মধ্যে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি বিদ্যালয়ের ৩৬ হাজার ২৩৫টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকেরও হাজার হাজার পদ খালি থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের অতিরিক্ত ক্লাসের পাশাপাশি একাধিক বিষয়ের পাঠদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের ওপর বাড়ছে কাজের চাপ এবং শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ বর্তমানে শূন্য।
ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা এরই মধ্যে কেটে গেছে বলে জানিয়েছে সরকার। এখন শূন্য পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষক সংকটও আগের তুলনায় অনেকটা কমেছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ শেষে বিদ্যালয়ে যোগ দেবেন।
তবে মাঠপর্যায়ে এখনো শিক্ষক সংকটের চিত্র স্পষ্ট। জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত পাঁচটি শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। গত ১৫ জানুয়ারি থেকে ওই একজন শিক্ষক দিয়েই চলছে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। প্রধান শিক্ষক আবদুল মোমিনকে একাই ৭০ শিক্ষার্থীকে পড়ানোর পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে।
আবদুল মোমিন জানান, শিক্ষক না থাকায় একই ব্যক্তিকে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ একসঙ্গে করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিকভাবে পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক অভিভাবকও সন্তানদের এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে প্রধান শিক্ষককে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম তদারকির পাশাপাশি শিক্ষকদের মধ্যে কাজের সমন্বয়, বিভিন্ন নথি সংরক্ষণ, আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগও তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
ফলে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলে কোনো সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব নিতে হয়। তখন নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজও করতে হয় তাঁকে। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য কার্যকর শিক্ষকসংখ্যা আরও কমে যায়।
কুমিল্লা সদর উপজেলার উত্তর রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ১০ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিদ্যালয়ের ২২৫ শিক্ষার্থীকে পড়ানোর পাশাপাশি তাঁকে প্রশাসনিক, আর্থিক ও সরকারি বিভিন্ন দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে।
মঞ্জুরুল আলম বলেন, দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানোর কারণে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। এতে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, নিয়োগ, জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে আইনি জটিলতার কারণে অনেক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
বিধি অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ২০ শতাংশ পদ সরাসরি নিয়োগ এবং ৮০ শতাংশ পদ সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করার কথা। ২০১৩ সালের নিয়োগ বিধিমালায় জ্যেষ্ঠতা-সংক্রান্ত একটি বিধানকে চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে রিট করা হয়। এর পর থেকেই প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। গত ২ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের একটি রায় বাতিল করলে জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বড় একটি বাধা দূর হয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিশেষ ব্যবস্থায় সরাসরি নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ করতে শিগগির সরকারি কর্ম কমিশনে আনুষ্ঠানিক চাহিদাপত্র পাঠানো হবে।
সহকারী শিক্ষক পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে তৎকালীন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান জানিয়েছিলেন, সারা দেশে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ সহকারী শিক্ষকের পদ খালি ছিল।
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সোনারুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত ছয়টি পদের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন চারজন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে প্রতিদিন প্রায় তিনটি ক্লাস বাতিল করতে হয়।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষককে প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে। কোনো কোনো সময় একই শিক্ষককে বাংলা, ধর্ম ও ইংরেজি—তিনটি বিষয়ের পাঠও দিতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, সহকারী শিক্ষক সংকট বর্তমানে অনেকটাই কমে এসেছে। তবে আরও প্রায় দুই হাজার শিক্ষক প্রয়োজন। নতুন নিয়োগ পাওয়া ১৪ হাজার শিক্ষক এখন পুলিশি যাচাইয়ের মধ্যে রয়েছেন। এরপর তাঁদের দুই মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ফলে শ্রেণিকক্ষে যোগদানের ক্ষেত্রে তাঁরা মূলত আরও দুই থেকে আড়াই মাস পিছিয়ে আছেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘বার্ষিক খাতভিত্তিক কর্মসম্পাদন প্রতিবেদন ২০২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১২ হাজার ৯৩৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন চারজন বা তারও কম। এর মধ্যে ১৩৩টি বিদ্যালয়ে শিক্ষক মাত্র একজন এবং ৬৩৩টি বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দুজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু বিদ্যালয় এখনো অত্যন্ত কম জনবল নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এমন পরিস্থিতিতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মানের পাশাপাশি একাধিক শ্রেণি একসঙ্গে পরিচালনার ক্ষেত্রেও গুরুতর প্রভাব পড়ছে।
২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গড়ে ৬ দশমিক ২৯ জন শিক্ষক ছিলেন। বিদ্যালয়প্রতি গড় শিক্ষকসংখ্যায় চট্টগ্রাম এগিয়ে ছিল—৬ দশমিক ৬৫ জন। এরপর ঢাকা ৬ দশমিক ৫২ এবং রাজশাহী ৬ দশমিক ৪৬ জন। অন্যদিকে সিলেটে বিদ্যালয়প্রতি গড় শিক্ষকসংখ্যা ছিল ৫ দশমিক ৫৯ এবং বরিশালে ৫ দশমিক ৮৯ জন।
প্রতিবেদনের ভাষ্য, বিদ্যালয়প্রতি শিক্ষকসংখ্যার এই আঞ্চলিক পার্থক্য শিক্ষা প্রদানের ধারাবাহিকতা ও মানে বৈষম্য তৈরির ইঙ্গিত দেয়।
ফরিদপুর সদর উপজেলার ২৪ নম্বর পূর্ব আলিয়াবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও শিক্ষক সংকট রয়েছে। সেখানে অনুমোদিত পাঁচটি পদের বিপরীতে কর্মরত শিক্ষক তিনজন। বিদ্যালয়টির তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সিহাব মোল্লা জানায়, শিক্ষকস্বল্পতার প্রভাব তাদের পড়াশোনায় সরাসরি পড়ছে। প্রায়ই একজন শিক্ষককে একই সময়ে দুটি শ্রেণির ক্লাস নিতে হয়। আবার কখনো একটি ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই অন্য শ্রেণিতে যেতে হয় তাঁকে।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষকস্বল্পতার পাশাপাশি অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সীমিত যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতিও রয়েছে। এসব সমস্যার সঙ্গে শিক্ষক সংকট যুক্ত হওয়ায় সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ২০২২’ প্রতিবেদনের তথ্যও প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরে। এতে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণির ৬১ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণির ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে শ্রেণি-উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। বাংলা বিষয়ে তৃতীয় শ্রেণির ৫১ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণির ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা এবং কোভিড-১৯ মহামারির পর কিছু এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। কেন বছরের পর বছর এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়।
তিনি বলেন, শিক্ষক সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুর্বল শিক্ষার্থীরা। কারণ তাদের বাড়তি সহায়তা দেওয়া কিংবা দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তখন কমে যায়।
রাশেদা কে চৌধূরীর মতে, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘসূত্রতা, যোগ্য শিক্ষক খুঁজে পাওয়ার সমস্যা এবং প্রত্যন্ত এলাকায় কাজ করতে কিছু শিক্ষকের অনাগ্রহ—সব মিলিয়ে শিক্ষক সংকট তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, অনেক বছর ধরেই শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি।